দূষণ, পানিতে আয়রন এবং প্রসাধনীর রাসায়নিক চুলের ক্ষতি করে। সেই ক্ষতি এড়াতে চুলের যত্নে আমাদের দেখানো ৫টি সেরা আয়ুর্বেদিক হার্বস ব্যবহার করতে পারেন।
চুলের যত্নে ৫টি সেরা আয়ুর্বেদিক হার্বস খুজে চলেছেন? খোজার খুব প্রয়োজন হয় না। আজকাল সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।
আয়ুর্বেদশাস্ত্রে চুল ও ত্বকের যত্নে বহু আগে থেকেই নানা হার্ব ব্যবহার করা হতো। এখনও চুলের যত্নে অনেক গুল্ম ব্যবহার করা হয়। চুলের জট, চুল পড়া এবং নতুন চুল গজাতে সহায়ক এই হার্বগুলোর উপকারিতা সবাই যে জানে তা নয়।
আজ আমরা পাঁচটি উপকারি হার্বের কথা বলবো যেগুলো আপনার চুলের যত্নে সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
চুলের যত্নে ৫টি সেরা আয়ুর্বেদিক হার্বস
প্রাকৃতিক রুপচর্চার ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদি টোটকা ভালো। কারণ প্রাথমিকভাবে চুলের যত্নে যখন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয় তখন চুলের স্বাস্থ্যও থাকে ভালো। এশিয়া অঞ্চলে যেভাবে দূষণ হচ্ছে তা দেখলে চুলের জন্য ন্যাচারাল হেয়ার কেয়ারের কথা ভাবতেই হয়। আজ আমরা সে খোঁজই দেব।
তবে এমন কোনো হার্বের নাম এখানে পাবেন না যেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। আপনার খুব কাছেই রয়েছে এমন হার্বই আমরা আপনায় খুঁজে দেব।
ভৃঙ্গরাজ
ভৃঙ্গরাজে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের মতো চুলের যত্নের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর পাওয়া যায়। এই উপাদানকে অনেকেই ‘চুলের রাজা’ বলে অভিহিত করেন। বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত, ভৃঙ্গরাজে ফ্ল্যাভোনয়েডস, ফাইটোস্টেরল এবং বিভিন্ন ধরণের চুল-বান্ধব উপাদান রয়েছে যা চুল পড়া কমায়।

উপকারিতা
চুলের গোড়ার মধ্যে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে প্রাকৃতিকভাবে চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে, ফলিকলকে সক্রিয় করে। তাছাড়া ভৃঙ্গরাজে থাকা অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য খুশকি এবং মাথার ত্বকের সংক্রমণ কমায়।
কিভাবে ব্যবহার করবেন
বাজারে ভৃঙ্গরাজের তেল খুঁজে পাওয়া যায়। নিয়মিত ভৃঙ্গরাজ তেল ২ চামচ করে চুলে মাসাজ করুন। আবার চুলের স্ক্রাব হিসেবে ভৃঙ্গরাজের গুড়ো ব্যবহার করতে পারেন। আজকাল সুপারস্টোরগুলোতে এই গুড়ো পাওয়া যায়।
ঘৃতকুমারী কিংবা অ্যালোভেরা
মেডিক্যাল নিউজের একপ্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০০৪ সাল থেকেই ঘৃতকুমারী ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া ঐ প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, অ্যালো ভেরাতে প্রায় ৭৫ ধরনের অ্যাক্টিভ উপাদান থাকায় বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহার করা যায়।
উপকার
অ্যালোভেরাতে ভিটামিন এ, সি এবং ই রয়েছে যা চুলের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে এবং চুলের ফলিকলগুলোকে ভেতর থেকে মেরামত ও পুনরুজ্জীবিত করে। তাছাড়া এই হার্ব ভিটামিন বি ১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের একটি সমৃদ্ধ উৎস। চুল পড়া রোধ করতে পারে এবং মাথার ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা যেমন চুলকানি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস এবং অতিরিক্ত তেল নিঃসরণকে কমাতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, অ্যালোভেরাতে শীতল করার গুণাবলি রয়েছে যা মাথার ত্বককে হাইড্রেট এবং ময়েশ্চারাইজ করে।

ব্যবহার করবেন যেভাবে
চুলের নানা প্যাক বানাতে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যালোভেরার পুষ্টিগুণ ক্যাপসুল ও ট্যাবলেট হিসেবে পাওয়া যায়। তবে একেবারে তাজা অ্যালোভেরা হাতের কাছে পেতে চাইলে বাসার ছাদে বা বারান্দায় টবে লাগিয়ে দিন ঘৃতকুমারী গাছ। অ্যালোভেরা গাছ থেকে জেল সংগ্রহ করে টিউবে ভরে অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। অ্যালোভেরা জেলের পাশাপাশি শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, ক্রিম, তেল, লোশনসহ নানা কসমেটিকস রয়েছে বাজারে।
মেথি
রান্নাঘরে মেথি সাধারন মশলা হিসেবেই ব্যবহৃত। কিন্তু চুলের যত্নেও রয়েছে মেথির ব্যবহার। সরাসরি মেথি ব্যবহার না করে মেথিকে বেইজ হিসেবে ব্যবহার করে চুলের যত্ন নেয়া সম্ভব।

উপকারিতা
মেথিতে আয়রন, প্রোটিন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি রয়েছে যা চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই হার্বে নিকোটিনিক অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা খুশকি ও চুল পড়া কমায়। মেথিতে আরও রয়েছে ভিটামিন এ, সি, কে, ফলিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড ও স্যাপোনিনে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য। যা চুলের শুষ্কতার মতো মাথার ত্বকের সমস্যা নিরাময় করতে সহায়তা করে। এটি টাক পড়া এবং চুল পাতলা হয়ে যাওয়াও রোধ করে। মেথি চুলের দ্রুত ও স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধির জন্য চুলের ফলিকলকেও পুষ্ট করে।
ব্যবহার করবেন যেভাবে
দ্রুত চুল গজাতে: মেথি সারারাত পানিতে ভিজিয়ে সকালে পান করলে দ্রুত চুল গজানোর কার্যকরী সমাধান পাওয়া যায়।
খুশকির সমস্যা: ২-৩ চা চামচ মেথি ১ কাপ পানিতে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এবার মেথিসহ কিছুটা পানি ব্লেন্ড করে পেস্ট করে নিন। এতে ২-৩ চা চামচ টক দই যোগ করুন। এবার এই প্যাকটি মাথার ত্বকে ভালভাবে লাগিয়ে নিন। ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করে তারপর শ্যাম্পু করে ফেলুন। খুব বেশী খুশকি সমস্যা হলে সপ্তাহে অন্তত ১ দিন আর কম হলে ১৫ দিনে একবার এই প্যাকটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
অকালপক্বতা রোধে: নারিকেল তেলে কমপক্ষে ২দিন মেথি ডুবিয়ে রাখুন। এই তেল কুসুম গরম করে মাথার ত্বকে মাসাজ করলে চুলের অকালপক্বতা দূর হবে।
আমলকী
যাদের চুল পড়ে যায় তাদের জন্য আমলকীই শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক হার্ব। যদিও এটিকে ফল আকারে পাওয়া যায় কিন্তু এই ভেষজের অসংখ্য ব্যবহার রয়েছে।
উপকারিতা
আমলকিতে থাকা ভিটামিন সি চুলের গ্রন্থিকোষগুলোতে পুষ্টি জাগিয়ে কোলাজেন প্রোটিন উৎপাদন করে, যা চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই কোলাজেনগুলো চুলের মৃত কোষগুলোকে নতুন করে প্রতিস্থাপন করতে সহায়তা করে। একইভাবে আমলা তেলে থাকা ফাইটো-পুষ্টি, ভিটামিন এবং খনিজগুলো মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে, চুলের সুস্থ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ভিটামিন ‘সি’র পাশাপাশি আমলা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলিতেও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এটি চুলের খুশকির সমস্যা দূর করে।
যেভাবে ব্যবহার করবেন
চুলকে ঝলমলে করার জন্য ঘরে তৈরি আমলা গুঁড়ো চুলে ব্যবহার করা হয়। আবার মাথায় মেহেদি দেয়ার সময় আরও ভালো রঙের জন্য কিছু আমলা গুঁড়ো মিশিয়ে নিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
আমলকি দিয়ে প্রাকৃতিক চুলের রঙও বানিয়ে নেয়া যায়। তাছাড়া আমলকির তেলও চুলকে মজবুত করতে সাহায্য করে।
ব্রাহ্মি
চুলের টনিক হিসেবে ব্রাহ্মি ব্যাপক জনপ্রিয়। এটি ব্যবহার খুব সরল। এজন্য অনেকেই চুলের যত্নে এই ভেষজ ব্যবহার করেন।

উপকারিতা
ব্রাহ্মি একটি প্রাকৃতিক কন্ডিশনার, যা চুলকে গোড়া থেকে রক্ষা করে। যাদের চুল পাতলা বা দুর্বল তাদের চুলের গোড়া শক্ত করার জন্য ব্রাহ্মির বিকল্প নেই। ব্রাহ্মির আরেকটি ওষধি গুণ হলো এটি অতিরিক্ত শুষ্ক মাথার ত্বকের খুশকি নিরাময়ে সহায়তা করে।
যেভাবে ব্যবহার করবেন
ব্রাহ্মির গুড়ো আজকাল বাজারেই পাওয়া যায়। যেকোনো তেলের সঙ্গে মিশিয়ে এটি ব্যবহার করতে পারেন। আবার হেয়ার প্যাকে কোনো ভাবনা ছাড়াই ব্রাহ্মির গুড়ো মেশাতে পারেন।
শেষ কথা
চুলের যত্নে ৫টি সেরা আয়ুর্বেদিক হার্বস সম্পর্কে জানা গেলো তবে? এই ভেষজগুলো খুব সহজেই খুঁজে পাবেন। আর ব্যবহারেও এদের বৈচিত্র্য রয়েছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া? সে ভয় করার প্রয়োজন নেই।



