যোগাসনেই আরোগ্য – এই বাক্য দ্বারা বুঝানো হয়েছে স্বাস্থ্য, সামৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জনে যোগাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাইতো স্বামী বিবেকানন্দ যোগাসনকে সকলের শিক্ষার জন্য জনসমক্ষে প্রচার করেছেন। সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষ এই যোগাসন করতে পারবে কেননা এটি একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
প্রায় ৪ হাজার বছর আগে ঋষি ও পণ্ডিতগণ এই যোগব্যায়াম আবিষ্কার করে। যোগাময় জীবন পরিচালনার ফলে আমরা সুস্থ, সবল ও কর্মময় জীবন লাভ করতে পারি। এই লেখাটিতে যোগাসনেই আরোগ্য এবং কয়েকটি যোগব্যায়ামের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
আমরা সকলে জানি স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। কিন্তু যথা সময়ে স্বাস্থ্যের পরিচর্যা না করার ফলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। আমরা চাইলে যোগাসনের মাধ্যমে প্রতিদিন কিছু যোগ ব্যায়াম করে রোগগুলো থেকে মুক্তি পেতে পারি।
একটা সময় মনে করা হতো যোগ একটি গুপ্তবিদ্যা ও গুহ্যতম তত্ত্ব। যার ফলে অনেকেই অন্যদের মাঝে যোগ শিক্ষা প্রচার করতেন না। এই চিন্তাধারার কারণে বর্তমান সময়ে যোগব্যায়াম প্রায় বিলুপ্তির পথে। আমাদের উচিত যোগব্যায়ামের প্রচলন চালু করা এবং নিজেদের সুস্থ রাখার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত যোগব্যায়াম করা।
বর্তমানে ২১ এ জুন ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ পালন করা হয়। যোগব্যায়ামের মাধ্যমে আমাদের শরীরের নানান ধরনের উপকার সাধিত হয়। সাধারণত যোগীরা নিজেদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করাকে নিজেদের মূল কর্তব্য মনে করে। চলুন যোগ ব্যায়াম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।
যোগাসনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব
নিজেদের মনকে ও শরীরকে সুস্থ রাখতে অবশ্যই প্রত্যেকের যোগাসন বা যোগব্যায়াম করা উচিত। যোগাসনের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তাধারা পরিশুদ্ধ হয় এবং শরীর থেকে বিভিন্ন রোগ বিলুপ্ত হয়।
বহুকাল আগে থেকেই এই যোগাসন চর্চা হয়ে আসছে।
বায়োকেমিক্যাল সংমিশ্রণে জটিল প্রক্রিয়ায় মানব দেহ পরিচালিত হয়। দেহের অসংখ্য অর্গান ও রস নির্গত হয়ে দেহকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে।
যদি সঠিকভাবে দেহের অর্গান ও রস নির্গত না হয় সেক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগের সম্মুখীন হয়।
যোগব্যায়াম মানব দেহ থেকে সঠিকভাবে অর্গান ও রস নির্গত হতে সাহায্য করে। এর ফলে আমাদের মনের ও শরীরের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়।
নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সবথেকে বড় সোপান হল কিছু সময় চুপ করে বসে থাকা। এবং বহিরাগত সকল চিন্তা থেকে নিজের ব্রেইনকে সুরক্ষিত রাখা।
যোগব্যায়াম মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যোগ ব্যায়ামের মূল উদ্দেশ্য ধীর ভাবে অপেক্ষা করে মনের গতি লক্ষ্য করা এবং নিজের মনকে তার রীতি অনুযায়ী চলতে দেয়া।
যতক্ষণ না আপনি বুঝতে পারবেন আপনার মন কি করছে ততক্ষণ আপনি কোনভাবেই মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।
আপনি প্রতিনিয়ত মনকে পর্যবেক্ষণ করলে এবং তার রীতি অনুযায়ী চলতে দিলে আস্তে আস্তে আপনার মন থেকে সকল খারাপ চিন্তা দূর হয়ে যাবে।
এভাবে করে কিছুদিন পরে আপনার মন থেকে খারাপ চিন্তাগুলো ক্রমশ কমে যাবে। খারাপ চিন্তা গুলো মন থেকে দূর হয়ে মন আপনার বশীভূত হবে।
এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য কিছুদিন ধৈর্য ধরে যোগ ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।
আমাদের মনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে যোগাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রত্যেকটি মানব দেহের জন্য যোগাসনের প্রয়োজনীয়তা অনেক।
যোগাসনের কিছু উপকারিতা
মানবদেহে যোগাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যোগাসনের মাধ্যমে আমরা বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক উন্নতি লাভ করতে পারি।
চলুন জেনে নেই যোগাসনের কিছু সাধারণ উপকারিতা সম্পর্কে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- শারীরিক সক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায়।
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
- সঠিকভাবে রক্ত চলাচলের সাহায্য করে।
- দেহের নমনীয়তা বৃদ্ধি পায়।
- হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট দূর করে।
- শরীরের বিভিন্ন অংশের মাসেলের বৃদ্ধি ঘটায়।
- কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
- বয়সন্ধি রোধ করে।
- পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা দূর করে।
- হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
- শারীরিক চাপ দূর করে ও শরীরে শক্তি সঞ্চালন করে।
- মানসিক চাপ দূর করে।
- নিজেদের চিন্তা ধারাকে পরিশুদ্ধ করে।
- মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- অস্থি সন্ধির নমনীয়তা বৃদ্ধি করে।
- শরীর ও মনকে সুন্দর করে তোলে।
- বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়।
যোগাসনের মাধ্যমে মানুষের শরীর ও চিন্তাভাবনা প্রাকৃতিক সাথে তাল মিলায় তথা যোগাসন হল জীবনের সাথে প্রকৃতির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম।
বিভিন্ন প্রকার অঙ্গভঙ্গি ও নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দ্বারা প্রকৃতির বাস্তবতাকে শরীরের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।
যোগব্যায়ামের ধারা প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে জগতের ঘনিষ্ঠতা আনা সম্ভব হয়। আত্মবিশ্বাস ও মনের প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার জন্য যোগাসন খুবই প্রয়োজনীয়।
দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গের সঠিক চালনা, যোগাযোগ ও সুস্থতা বজায় থাকে যোগাসন বা যোগব্যায়ামের মাধ্যমে।
যোগাসন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
যোগাসনের কার্যকারিতা এবং সুফল বিবেচনা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করা হয়েছে।
এই গবেষণার সাহায্যে কিভাবে এগুলো আমাদের শরীর এর উপর প্রভাব ফেলে এবং কাজ করে এই সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানা গেছে।
২০২০ সালে ৬৭২ জন মানুষ নিয়ে যোগাসনের উপকারিতা জানার জন্য ১ টি গবেষণা করা হয়।
এই গবেষণায় দেখা যাই সবগুলো মানুষের অনুভূত চাপের পরিমাপের উপর যোগাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
অন্য একটি গবেষণায়, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রায় ১০৮৪ জন মানুষকে নিয়ে ১৪টি এক্সপেরিমেন্ট করা হয় যেখানে দেখা গিয়েছে যোগাসন বিভিন্নভাবে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণায় ৬৮৮ জন ভিক্টিম ছিল। তবে এখানে ১৪টি পরীক্ষা থাকলেও ১১টি সম্পন্ন করা হয়েছিল।
এই পরীক্ষায় দেখা যায় যোগাসন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ভারসাম্য উন্নত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
যোগ ব্যায়ামের ঝুঁকি সমূহ এবং মুক্তির উপায়
যোগাসনেই আরোগ্য তে যোগব্যায়ামের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। এটা দেখতে যতটাই সহজ মনে হয় কিন্তু করতে ঠিক ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন।
এই ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হলো হাঁটু ও পা মচকে যেতে পারে। যোগ ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি ঝুঁকি থাকে প্রবীনদের।
চলুন যোগাসনের ঝুঁকি সমূহ থেকে বাঁচার কিছু উপায় সম্পর্কে জেনে নেই।
- নতুনরা সব সময় কঠিন যোগাসনের গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন।
- প্রাথমিক অবস্থায় একা একা যোগাসনের ট্রাই না করে একজন দক্ষ প্রশিক্ষকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
- যোগাসনের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা এড়িয়ে চলুন।
- গর্ভবতী মহিলা ও অতিরিক্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে যোগব্যায়াম থেকে দূরে থাকা উত্তম।
- স্বাস্থ্যে সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিদের ডাক্তারের পরামর্শ এবং যোগব্যায়ামে দক্ষ প্রশিক্ষকের নির্দেশনা মেনে ব্যায়াম করা উচিত।
- যোগব্যায়ামের সময় অবশ্যই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সহজ কিছু যোগ ব্যায়াম
চলুন সহজ ৫টি যোগাসনেই আরোগ্য সম্পর্কে জেনে নেই যেগুলো সকল বয়সের মানুষ প্রতিদিন করতে পারলে কোন ধরনের ওষুধ ছাড়াই কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিক্স, অনিদ্র, সর্দি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মানসিক অবসান সহ বহু ধরনের রোগ বা অসুখ থেকে মুক্তি লাভ করবেন।
১.ওম প্রণয়ন
পদ্মাসন বসে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন এবং তারপর মুখ দিয়ে “ওওওওওওওওওওওমমম” উচ্চারণের মাধ্যমে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন।
প্রতিদিন কমপক্ষে এইভাবে ৫ থেকে ৭ বার রিপিট করুন। যোগাসনের সময় অন্যান্য সকল চিন্তা থেকে নিজের মনকে দূরে রাখবেন।
২.বস্তিকা
পদ্মাসন বসে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন এরপরে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড নিঃশ্বাস ধরে রাখুন, তারপর আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন।
এইভাবে করতে থাকুন একাধারে ৫ থেকে ১০ মিনিট।

৩.ধনুরাসন
এই ব্যায়ামটি করার জন্য প্রথমে উপর হয়ে শুয়ে পড়ুন। এরপরে আপনার হাত দুটিকে উপরমুখী করে শরীরের দুপাশে রাখুন।
তারপরে আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ছাড়া অবস্থায় আপনার হাঁটু বাঁকিয়ে নিতম্বের কাছে আনুন।
এরপরে হাত পিছনের দিকে নিয়ে আপনার পায়ের গোড়ালি শক্ত করে চেপে ধরুন।

এরপরে শ্বাস নেয়া অবস্থায় গোড়ালি দুটোকে নিতম্বর থেকে দূরে সরিয়ে নিন।
২০ সেকেন্ড পরে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন। এভাবে করে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বার করুন।
৪.অনুলোম বিলোম
পদ্মাসন বসে চোখ বন্ধ করে বাম হাত ধ্যানমুদ্রায় হাঁটুর উপরে রাখুন, তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ডান নাক চেপে বাম নাক দিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন।
পুরোপুরি নিঃশ্বাস গ্রহণের পরে বাম নাক চেপে ডান নাক দিয়ে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন।

পুনরায় ডান নাক দিয়ে নিঃশ্বাস গ্রহণ করে, ডান নাক চেপে বাম নাক দিয়ে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন। এইভাবে করতে থাকুন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ বার।
৫.সেতুবন্ধ আসন
প্রথমে সমতল মেঝেতে শুয়ে পড়ে হাঁটু ও গোড়ালি একই রেখা বরাবর রেখে আস্তে আস্তে পা ভাজ করে নিন।
এরপরে হাত দুটো দুপাশ থেকে নিচের দিকে মুখ করে রেখে আস্তে আস্তে শ্বাস নেয়া অবস্থায় পিঠ উপরে দিকে তুলুন।
এবং সেই সাথে হাত দুটো দিয়ে আপনার পায়ের গোড়ালি ধরার চেষ্টা করুন।

এভাবে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে পিঠ নামিয়ে আনুন।
এই পদ্ধতিতে প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৫ বার সেতুবন্ধ আসন করুন।
আমাদের শেষকথা
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ আশা করি যোগাসনেই আরোগ্য উক্তিটির গুরুত্ব জানতে পেরেছেন। ভারতের জনপ্রিয় লেখক ডঃ রমেন মজুমদার “যোগাসনে রোগ আরোগ্য” বইয়ের মধ্যে যোগাসনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমাদের সুস্থ থাকার জন্য যোগাসন করা অতি গুরুত্বপূর্ণ।



