ব্রণ সমস্যার ঘরোয়া সমাধান করুন হাতের কাছে থাকা উপাদান দিয়ে। রূপচর্চায় ব্রণ একটি বহুল আলোচিত শব্দ। ব্রণের সমস্যায় নাজেহাল হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ক্যামিকেল পণ্য ব্যবহারে ত্বক হারায় লাবণ্য।
ব্রণ সমস্যার ঘরোয়া সমাধান ত্বক করে উজ্জ্বল আর লাবণ্যময়। ব্রণ বা গোটা বের হওয়া ত্বকের একটি সাধারণ সমস্যা। যদিও এটি বয়ঃসন্ধিতে বেশি দেখা যায়, তবে শারীরিক বিভিন্ন অসুস্থতা এবং ত্বকের অপরিচ্ছন্নতার জন্য ব্রণ হতে পারে যেকোনো বয়সে। আমাদের তৈলগ্রন্থি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ভিতরে পুঁজ জমে ধীরে ধীরে ব্রণ সৃষ্টি হয়।
সূচীপত্র :
- ব্রণ সমস্যার ঘরোয়া সমাধান
- ব্রণ কেন বের হয়?
- মেয়েদের ব্রনের সমস্যা
- ছেলেদের ব্রণের সমস্যা
- ব্রণের সমস্যার ১১টি ঘরোয়া সমাধান
- ব্রণের সমস্যা ভিতর থেকে নির্মূল করার উপায়
- উপকারী টিপস
- সতর্কতা
- Recommended Products
- FAQ
- উপসংহার
- তথ্যসূত্র
ব্রণ কেন বের হয়?
মুখের লোমকূপের গোড়ায় তেল নিঃসরণ গ্রন্থি আর মৃত কোষের অবশিষ্ট অংশ মিলে ব্রণ তৈরি হয়। ব্রণ মূলত বয়ঃসন্ধি কালের ত্বকের সমস্যা। তবে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং অপরিচ্ছন্ন জীবনযাত্রার কারণে পরিণত বয়সেও এই সমস্যা খুব ভোগায় ছেলে মেয়ে উভয়কে।
National Library Of Medicine তথ্য প্রকাশ করেছে যে-
মেয়েদের ব্রনের সমস্যা :
বয়ঃসন্ধি কালে কিশোরীরা শারীরিক-মানসিক বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে অবসাদগ্রস্ত থাকে, ঠিকমত ঘুম হয় না, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাব, ইত্যাদি কারণে শরীরে হরমোন প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এসব কারণে ত্বকে ব্রণ দেখা যায়। শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বকে যেন ধুলাবালি জমে লোমকূপ বন্ধ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ব্রণ মুক্ত থাকার প্রধান শর্ত।
ছেলেদের ব্রণের সমস্যা :
ছেলেদের ত্বকের এবং ব্রণের ধরণ মেয়েদের চেয়ে ভিন্ন। মূলত উঠতি বয়সে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শরীর এবং ত্বকের পরিবর্তন হয়। তখন ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়। বাইরের ধূলাবালি ত্বকে জমে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণের সৃষ্টি হয়। তাই ছেলেদের ত্বকে ব্রণের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। অনেকের টিনেজ বয়স পেরিয়ে গেলেও এই সমস্যা থেকে যায়।
ব্রণের সমস্যার ১১টি ঘরোয়া সমাধান :
ব্রণের সমস্যা নিয়ে কষ্ট পায়নি এমন মানুষ কমই আছে। ছেলে মেয়ে উভয়েরই ত্বকের রকমফেরে বিভিন্ন কারণে ব্রণ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই সমস্যার কবল থেকে মুক্তি পেতে মানুষ কত ক্রীম ব্যবহার করে, কত রূপচর্চা করে বা পার্লারে দৌড়াদৌড়ি করে। কিন্তু তবুও সহজে মুক্তি মিলেনা। প্রাকৃতিক রূপচর্চার মাধ্যমে পেতে পারেন স্থায়ী সমাধান, এমন কিছু উপাদান নিচে দেওয়া হলো:
১। আপেল ও মধুর মিশ্রণ :
উপাদান:
- আপেল

- মধু
- পানি
ব্যবহার:
অর্ধেক আপেলকে পিষে সাথে ৪/৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরী করে আক্রান্ত ত্বকে লাগান। শুকিয়ে গেলে পানি মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটা ব্রণ এবং ব্রণের দাগ সমস্যা নিরসনের জনপ্রিয় ঘরোয়া উপায়।
২। লেবুর রস
উপাদান :
- লেবু
- দারুচিনির গুড়া
- কুসুম গরম পানি
ব্যবহার:
লেবুর রস আর দারুচিনি গুড়া মিশিয়ে তুলার সাহায্যে ব্রণের উপর লাগাতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে লাগাতে পারলে ভাল হয়। সকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করুন।
৩। অ্যালোভেরা ও হলুদ প্যাক
উপাদান :
- অ্যালোভেরা জেল
- হলুদ
- মধু
- দুধ
- গোলাপ জল
ব্যবহার :
অ্যালোভেরা জেলের সাথে এক টেবিল চামচ হলুদ, মধু, দুধ এবং কয়েক ফোঁটা গোলাপ জল মিশিয়ে আক্রান্ত ত্বকে প্রয়োগ করুন। ১৫ মিনিট পর শুকালে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। অ্যালোভেরাতে রয়েছে এনজাইম, পলিসেকারিডস এবং নানা পুষ্টি উপাদান। এটির অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদানের কারণে ব্রণ দূর করে। হলুদ ও ত্বকের প্রদাহ রোধ করে।
৪। তুলসী পাতার রস
উপাদান :
- তুলসী পাতা
- কুসুম গরম পানি
ব্যবহার:
তুলসী পাতাকে রস করে আক্রান্ত স্থানে লাগাতে হবে। শুকিয়ে গেলে কুসুম গরম পানি দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। এটি ব্রণের জন্য খুব উপকারী। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর আয়ুর্বেদীক গুণ।
৫। পুদিনা পাতা
উপাদান :
- তাজা পুদিনা পাতা
- পানি
ব্যবহার:
তাজা পুদিনা পাতা বেঁটে ব্রণের উপর লাগাতে হবে। ২০মিনিট পর শুকালে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। গরমের দিনে যেসব ফুসকুড়ি বা ব্রণ হয় সেগুলোর ব্যথা দূর করতে পুদিনা পাতা বেশ কার্যকরী।
৬। রসুন
উপাদান :
- ২/৩ কোয়া বাটা রসুন

ব্যবহার:
রসুন বাটার রস ব্রণের জায়গায় লাগান। ৫মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। রাতে ঘুমানোর আগে লাগালে পরদিন ত্বকের পরিবর্তন টের পাবেন। রসুন বর্ণযুক্ত ত্বকে ব্যবহার করা যেমন সহজ, তেমনি কার্যকরী।
৭। শসার রস ও মধু
উপাদান :
- শসা
- মধু
- চালের গুঁড়া
ব্যবহার :
শসার রস ত্বকের তৈলাক্ততা দূর করে। বাইরে থেকে ফিরে শসার রস দিয়ে মুখ পরিষ্কার করলে ত্বক ভাল থাকে। শসার রস আইস কিউব করেও ব্যবহার করা যায়, এটা ওপেন পোরস ঠিক হতে সাহায্য করে। স্ক্রাব তৈরী করতে সাথে একটু মধু ও চালের গুঁড়া মিশিয়ে নিন। তবে ব্রণ থাকলে স্ক্রাব করা যাবে না।
৮। গ্রিণ টি
উপাদান :
- গ্রিণ টি
- গরম পানি
- তুলা

ব্যবহার:
গ্রিণ টি বানিয়ে কিছুক্ষণ ঠান্ডা হতে দিন। কুসুম গরম হলে তুলা দিয়ে বর্ণযুক্ত ত্বকে ব্যবহার করুন। এটি ব্রণ কমিয়ে ত্বক উজ্জ্বল করবে।
৯। কাঁচা হলুদ ও চন্দনগুড়া
উপাদান :
- কাঁচা হলুদ
- চন্দন কাঠের গুঁড়া

ব্যবহার:
এই দুটি উপাদান ব্রণ দূর করতে উপকারী। সমপরিমাণ কাঁচা হলুদ বাটা এবং চন্দন কাঠের গুঁড়া নিয়ে পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরী করুন। এটি ত্বকে লাগিয়ে শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। এই মিশ্রণ ব্রণের সাথে দাগ ও দূর করে।
১০। ডিমের সাদা অংশ:
উপাদান :
- ডিম
- লেবু
- পানি
ব্যবহার:
ডিমের সাদা অংশ ব্রণের স্থানে লাগিয়ে সারা রাত রাখতে হবে। সাথে অল্প লেবুর রস দিলে ভাল হয়। আধা ঘন্টা পর শুকালে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ব্রণের সাথে ত্বকের শুষ্কভাব দূর করে।
১১। মুলতানি মাটি ও নিম পাতা
উপাদান :
- মুলতানি মাটি
- নিম পাতা

- গোলাপ জল
ব্যবহার:
৪/৫ নিম পাতা নিয়ে ধুয়ে পিষে নিতে হবে। সাথে ১চামচ মুলতানি মাটি ও অল্প গোলাপ জল মিক্স করে প্যাক তৈরী করুন। এটি ত্বকে প্রয়োগ করে শুকানো পর্যন্ত রাখুন। তারপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। নিম পাতার নির্যাস জীবাণু ধ্বংশ করে এবং মুলতানি মাটি ত্বক উজ্জ্বল করে।
ব্রণের সমস্যা ভিতর থেকে নির্মূল করার উপায়:
কেমন হবে যদি ব্রণকে শরীরের ভিতর থেকে নির্মূল করা যায়? কিছু খাদ্যাভ্যাস বদল এবং প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে খুব সহজেই চিরবিদায় দিতে পারেন ব্রণকে।
- তেল জাতীয় খাবার যথাসম্ভব পরিহার করুন। সয়াবিন বা সরিষার তেলের বদলে খাবারে ব্যবহার করুন অলিভ অয়েল। এটি ইমিউন সিস্টেম উন্নত করে এবং সহজে হজম হয়।
- বদহজম বা হজমের সমস্যা থেকেও ব্রণ হয়। তাই সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করুন। সবুজ শাকসবজি হজমে সাহায্য করে যেমন- পালংশাক, বাঁধাকপি, ডাটা শাক, লেটুস ইত্যাদি।
- খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন শসার জুস। এতে রয়েছে ভিটামিন এ,সি,ই, অ্যামিনো এসিড এবং পানি।এটি ত্বককে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করে এবং ভিতর থেকে ত্বক উজ্জ্বল করে।
- দিনে অন্তত ১কোয়া কাঁচা রসুন খাওয়ার অভ্যাস করুন। এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান রক্ত শোধন করে।
- টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন সি যা ব্রণের সমস্যা নিরসনে সাহায্য করে। এছাড়া টমেটোর বায়োফ্লেভানয়েডস ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক সুস্থ করে।
- এনার্জি ড্রিঙ্ক হিসেবে চা/কফির বদলে খাদ্য তালিকায় আনুন গ্রিণ টি। এটি দেহের টক্সিক পদার্থ দূর করে এবং ব্রণের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংশ করে।
উপকারী টিপস:
- পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন শরীর মন ভাল রাখতে দৈনিক ৬-৮ঘন্টা ঘুমাতে হবে। ঘুমের সময় শরীরের প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসরণ বা তৈরী হয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ব্রণের প্রকোপ দেখা যায়।
- যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করতে হবে। শরীরে পানি কমে যাওয়া ব্রণ হওয়ার অন্যতম কারণের একটি। গরমের দিনে যারা অতিরিক্ত যারা অতিরিক্ত ঘামে তাদের শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়। সারাদিন প্রচুর পানি পান করতে হবে।দৈনিক কমপক্ষে আট গ্লাস পানি পান করা জরুরি।
- ফাস্টফুড, ডিপ-ফ্রাই, কোমল পানীয় বেশি খেলে ব্রণের প্রবণতা বাড়তে পারে।
- বাইরে থাকলে জীবাণুর সংক্রমণ রোধ করতে সুযোগ পেলেই ত্বকের উপরিভাগ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। যাদের ত্বক তৈলাক্ত তাদের এ বিষয়টি মেনে চলা জরুরি। কারণ তৈলাক্ত ত্বকে দ্রুত ময়লা জমে।
Recommended Products :
ব্রণযুক্ত ত্বক এবং ব্রণের দাগ থেকে মুক্তি পেতে ন্যাচারাল স্কিন কেয়ার করার মত কিছু ভালো অরগানিক কসমেটিক প্রোডাক্টের নাম নিচে দেওয়া হলো:
১. Aarong Earth Sandalwood Face Mask
২. Skin Cafe Pure & Natural Aloe Vera Gel 98%
৩. Biotique Fresh Neem Pimple Control Face Wash
৪. Lotus Herbals Acnegel Tea Tree Anti-Pimple and Acne Gel
সতর্কতা : আপনার ব্রণের ধরণ বুঝে ত্বকের যত্নে উপরোক্ত ঘরোয়া উপায় ব্যবহার করুন।এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য ব্যবহার করুন। স্পর্শকাতর ত্বক হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
FAQ:
১. কি কি কারণে ব্রণ হয়?
উত্তর: ব্রণ হওয়ার অনেকগুলো কারণের কথা বলে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে প্রধান হলো হরমোন ক্ষরণের তারতম্য বা অভাব, জীবাণুর সংক্রমণ, ত্বকের অযত্ন, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, তৈলাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া ইত্যাদি।
২. ব্রণ দূর করার প্রাকৃতিক উপায় কি?
উত্তর: প্রাকৃতিকভাবে ব্রণ দূর করতে আপনার দৈনন্দিন রুটিনে স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকা, প্রচুর পানি পান, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ স্কিনকেয়ার রুটিন অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করুন।
৩। কোন ধরনের ত্বকে বেশি ব্রণ হয়?
উত্তর: মূলত তৈলাক্ত ত্বকে ময়লা জমে বেশি ব্রণ হয়। তবে আবহাওয়া ও জীবনযাত্রার অনিয়মের কারণে অন্যান্য ধরনের ত্বকে ও ব্রণ দেখা যায়।
উপসংহার :
দাগহীন কোমল ত্বকের জন্য ব্রণ সমস্যার ঘরোয়া সমাধান খুব কার্যকর। বিভিন্ন প্রকার ক্যামিকেল পণ্য যদিও হাতের নাগালেই রয়েছে,তবে এদের প্বার্শপ্রতিক্রিয়া ও কম নয়। তবে বংশগত বা হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সরণাপণ্য হওয়া উচিত। পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করুন এবং সুস্থ-সুন্দর থাকুন।



