ত্বকের যত্নে ভিটামিন কিভাবে ব্যবহার করবেন? মূল চারটি ট্রপিক্যাল ভিটামিনের ব্যবহার ও উপকারিতা জেনে নিন।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন নিয়ে বহু আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে। ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনগুলোকে অধিকাংশ সময় ট্রপিক্যাল ভিটামিন বলে আখ্যায়িত করা হয়।
শরীরের সবচেয়ে বড় বহিঃআচ্ছাদন আমাদের ত্বক। প্রতিদিনের দূষণ, ধুলোবালিতে হোক বা হরমোনাল সমস্যায় ত্বকের নানাবিধ ক্ষতি হয়ে থাকে। বিশেষত পিউবার্টির আগমনকালে হরমোনাল কারণে ত্বক খুবই তৈলাক্ত প্রকৃতির হয়ে যায়।
ব্যাকটেরিয়ার পছন্দের খাদ্য ত্বকের এই ফ্যাট। এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া ত্বককে ইরিটেট করে। ফলে ত্বকে অ্যাকনে, এগজিমা প্রভৃতি নানা রকমের সমস্যা দেখা যায়।
ত্বককে ভেতর থেকে সুস্থ থাকতে দরকার হয় পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিনের। কিন্তু সেটা কিভাবে ব্যবহার করবেন? জানা আছে কি? না জানা থাকলে চলুন জেনে নেয়া যাক।
ট্রপিক্যাল ভিটামিন বা ত্বকের ভিটামিন কি?
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিনের সমন্বয়ে ত্বকের কোষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ট্রপিক্যাল ভিটামিন পাওয়া যায়। ত্বকের জন্য উপযোগী এই ভিটামিন সেরাম, এশেনসিয়াল অয়েল বা অন্য অনেক প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়।
সরাসরি না খেয়ে এই ভিটামিন ত্বকে প্রয়োগের মাধ্যমে ত্বকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। অনেকে মনে করেন ট্রপিক্যাল ভিটামিন কাজ করে কি-না। হ্যা, বাস্তবে কাজ করে। শুধু আপনাকে ব্যবহারের প্রক্রিয়া জানতে হবে।
ট্রপিক্যাল ভিটামিন ব্যবহারের পদ্ধতি
আপনার ত্বকের প্রাকৃতিক রুপচর্চা বা যেকোনো পরিচর্যার ক্ষেত্রে ভিটামিন জরুরি। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসহ প্রয়োজনীয় ভিটামিনের সমন্বয়ে ত্বকের অনেক সমস্যার সমাধান করা যায়।
আজ আমরা সেই প্রক্রিয়াই এখন দেখাব।
ভিটামিন এ
ত্বকের স্বাভাবিকতার জন্য ভিটামিন এ একটি জরুরি উপাদান। এর উপকারি দিকগুলো হলো:
- ত্বকের জেল্লা বাড়াতে ভিটামিন এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ‘এ’-তে থাকা রেটিনল ত্বকের নতুন কোষ উৎপন্ন করতে সাহায্য করে।
- সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি বা ইউভি রে থেকে ত্বকের স্বাভাবিক রঙ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচায়।
- ভিটামিন ‘এ’-তে বিটা-ক্যারোটিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যার ফলে এটি ত্বকের ফ্রি র্যাডিকেলসের সঙ্গে লড়তে পারে।
- ত্বকের রিঙ্কেলস কমাতে ভিটামিন ‘এ’ অনেক কার্যকরী।
- ত্বককে উজ্জ্বল করতে ভূমিকা রাখে
- ব্রণ কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বককে বিভিন্ন ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন এ ব্যবহার করবেন কিভাবে
প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারীর জন্য দৈনিক ৭০০ মাইক্রো গ্রাম ভিটামিন ‘এ’ এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ৯০০ মাইক্রো গ্রাম ভিটামিন ‘এ’ শরীরে প্রয়োজন।

যদি ত্বকে ভিটামিন এ’র উপকার পেতে হয় তাহলে কয়েকটি পরামর্শ মেনে চলুন:
- সবুজ ও হলুদ শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, দুধ ও কলিজায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ। খাদ্যতালিকায় প্রতিনিয়ত ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করুন।
- গাঁজরের তেল ব্যবহারে ফেসপ্যাক বানিয়ে নিতে পারেন।
- লাল ও হলুদ রঙের ফল বা সবজি খেলে ভিটামিন এ পাবেন।
ভিটামিন বি
আট প্রকার বি ভিটামিনকে বলে মিসনোমার। এসব ভিটামিন বিভিন্ন উপায়ে আমাদেরকে সুস্থ রাখে। আট প্রকাশ ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন বি৩, ভিটামিন বি৭ ও ভিটামিন ১২ ধরন ত্বককে ভালো দেখাতে সাহায্য করে। ত্বককে ক্লান্ত, ফ্যাকাসে ও অসুস্থ দেখালে আপনার আরো বি১২ প্রয়োজন, যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করবে।

চলুন ত্বকের জন্য ভিটামিন বি কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ তা দেখে নেয়া যাক:
- ভিটামিন বি৩ বা নিয়াচিন ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখে। প্রতিদিন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর যথাক্রমে ১৬ ও ১৪ মিলিগ্রাম বি৩ প্রয়োজন।
- ভিটামিন বি৭ বা বায়োটিনের অভাব হলে ত্বকে একজিমার মতো চর্মরোগ হতে পারে।
- পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ভিটামিন বি৭ এর দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (আইওএম) ১৯ বছর বা তদোর্ধ্ব বয়সি মানুষদের প্রতিদিন ৩০ মাইক্রোগ্রাম বায়োটিন গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
- প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর প্রতিদিন ২.৪ মাইক্রোগ্রাম বি১২ খাওয়া উচিত। ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন বি৩ এর ভালো উৎস হলো মাছ, মাংস, বাদাম, ডাল/শিম জাতীয় খাবার (লেগিউম) ও গোটা শস্য।
- ত্বকের প্রদাহ কমাতে ভিটামিন বি জরুরি।
ভিটামিন বি ত্বকের যত্নে কিভাবে ব্যবহার করবেন
Vitamin B অনেক টোনারে পাবেন। তবে ত্বকের জন্য ভিটামিন বি এর চাহিদা খাবার কিংবা সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।
ভিটামিন সি
ত্বকের যত্নে ভিটামিন ‘সি’র উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। অ্যাসকর্বিক অ্যাসিড নামেও পরিচিত এ ভিটামিন ত্বক উজ্জ্বল এবং লাবণ্যময় করে তোলে। যার কারণে ত্বকের যেকোনো সমস্যা সমাধানে এটি টনিকের মতো কাজ করে।

Vitamin C’র কিছু উপকারি দিক হলো:
- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা, কুঁচকানো চামড়া সহ বিভিন্ন বয়সজনিত দাগ-ছোপের দেখা মেলে। Vitamin C দেহের কোলাজেন সংশ্লেষণ বাড়িয়ে ত্বকের বার্ধক্য জনিত লক্ষণগুলো অনেকটা কমায়।
- সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে লালচে দাগ ফেলে। তাছাড়া এর কারণে ত্বকে টান পড়ে ও রুক্ষ্ম হয়ে যায়। ভিটামিন-সি সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করতে পারে।
- ত্বকের শুষ্কভাব কমাতে এবং ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।
- ভিটামিন সি’তে অ্যাসকর্বিক অ্যাসিড থাকার কারণে এটি কোলাজেন গঠন সক্রিয় করে তুলতে পারে এবং দ্রুত ক্ষতস্থান নিরাময়ে সহায়তা করতে পারে। তবে, এটি খাওয়ার চেয়ে ক্ষত স্থানে প্রয়োগ করে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।
- ত্বকের দাগ-ছোপ দূর করতে Vitamin C অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। ত্বকে ভিটামিন সি প্রয়োগ করে কালো দাগ দুর করা যায়।
- Vitamin C-তে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি রয়েছে। যার কারণে এটি ত্বকের লালচে ভাব, ব়্যাশ, জ্বালা-ব্যথা দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন সি এর ব্যবহার করবেন কিভাবে
- প্রধানত ফল ও কাঁচা সবজি হচ্ছে Vitamin C’র মূল উৎস। কিছু ফল ও শাকসবজি যেমন- লেবু, কমলা, পেয়ারা, ব্রকোলি ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমানে Vitamin C থাকে। তাই ভিটামিন সি পেতে এগুলো খাওয়া যেতে পারে।
- Vitamin C সমৃদ্ধ খাবারের সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে এগুলো কাঁচা অবস্থায় খাওয়া বেশি ভালো।
- ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ই একসঙ্গে ব্যবহার করলে পাওয়া যায় আরও বেশি উপকারিতা।
ভিটামিন ই
Vitamin E ত্বকের জন্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা কম বেশি সবাই শুনেছি। এর অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট গুণে অনেক সমস্যাই হয় সমাধান। স্কিনকেয়ারের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনটির গুরুত্ব একটু বেশিই। এই ভিটামিনের উপকারি দিক:
ভিটামিন E’তে থাকা অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট ত্বকের নানা সমস্যাই সমাধান করে। Vitamin E-এর অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট গুণের কথা একাধিক গবেষণাতেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান ডার্মাটোলজি অনলাইন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এই গুণের উল্লেখ রয়েছে।

এই ভিটামিন ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই এই শীতে ভিটামিন ই প্রাকৃতিক ময়শ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে।
ত্বকের বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে Vitamin E। মুখে সহজেই বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না। ভিটামিন E-এর ব্যবহারে ত্বক থাকে নরম। তাই নিয়মিত ভিটামিন ই ব্যবহার করতে পারেন।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন ই কিভাবে ব্যবহার করবেন?
ভিটামিন ই সরাসরি ত্বকে না লাগানোই ভালো। আসুন দেখে নেই ভিটামিন ই ক্যাপসুল ও প্রাকৃতিক রুপচর্চার কিভাবে সমন্বয় করা যায়।
প্রথম পদ্ধতি
উপকরণ: গোলাপজল ও ভিটামিন ই
কার্যপ্রণালী
- ২ চামচ গোলাপ জল নিন।
- একটা ভিটামিন ই ক্যাপসুল থেকে এক্সট্র্যাক্ট বের করে নিন।
- দুটো মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন।
- মুখে লাগিয়ে নিন।
- ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি
উপকরণ: অ্যালোভেরা ও ভিটামিন ই
কার্যপ্রণালী
- একটি পাত্রে ২ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল নিন।
- এক চামচ গোলাপ জল মিশিয়ে দিন এবং একটি ভিটামিন ই ক্যাপসুল এক্সট্র্যাক্ট মেশান।
- প্রতিটি উপাদান ভালো করে মিশিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন।
- সেটি আপনার মুখে ভালো করে লাগিয়ে নিন।
- ১৫-২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।
তৃতীয় পদ্ধতি
উপকরণ: গ্রিন টি, মধু ও ভিটামিন ই
কার্যপ্রণালী
- এক কাপ নিন গ্রিন টি ঠান্ডা করে নিতে হবে।
- এর সঙ্গে ১ চামচ মধু মিশিয়ে দিন।
- ২টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল নিন। তার এক্সট্র্যাক্ট বের করে নিন।
- ভিটামিন ই ও গ্রিন টি মিশিয়ে দিন।
- প্রত্যেকটি উপাদান ভালো করে ফুটিয়ে নিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন।
- এবার ওই মিশ্রণ ভালো করে ঠান্ডা করে নিন।
- তারপর সেটি মুখে লাগান।
- নিয়মিত ব্যবহার করুন।
শেষ কথা
ত্বকের যত্নে ভিটামিন অনেক সুবিধা দিতে পারে। সেটি বের করে নেয়া কঠিন। আমরা আজ সংক্ষেপে সেগুলোই উপস্থাপন করতে চেয়েছি। আশা করি কাজে এসেছে।



