সময়ের সাথে সাথে মেছতার হরেক চিকিৎসা আবিষ্কৃত হলেও আয়ুর্বেদিক উপায়ে মেছতার সমাধান এখনও কম জনপ্রিয় নয়। আজ মূলত তিনটি আলাদা ধারায় মেছতার প্রাকৃতিক সমাধান দেখানো হবে।
আয়ুর্বেদিক উপায়ে মেছতার সমাধান করতে হলে প্রথমে এর কারণ, লক্ষ্মন এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত পদ্ধতিগুলো জানা জরুরি।
এ কথা সকলেরই জানা মেছতা এক ধরনের পিগমেন্টেশন ডিজর্ডার। আর এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব আয়ুর্বেদিক উপায়েই। বাজারে মেছতা দূর করার অনেক প্রসাধনী থাকলেও সেগুলোতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে অনেক।
আমরা আজ মূলত এই বিষয়গুলোই আলোচনা করবো। কারণগুলো উল্লেখের পাশাপাশি জানাবো কিভাবে এই সমস্যা দূর করা যায় প্রাকৃতিক রূপচর্চার সহজ প্রক্রিয়ায়।
মেছতা কেন হয়?
মেছতার কারণ ডাক্তাররা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেন নি। তবে ত্বকে মেলানোসাইটস/মেলানিন এর ত্রুটির কারণে এমনটি হতে পারে। হালকা ত্বকের মানুষের তুলনায় গাঢ় ত্বকের মানুষের শরীরে মেলানোসাইটিস বেশি থাকে বলে গাঢ় ত্বকের টোনযুক্ত মানুষের মেছতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
মেছতা হওয়ার স্বাভাবিক কিছু কারণ
- গর্ভাবস্থায় হরমোন চিকিৎসা বা জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি গ্রহণের সময় হরমোনের পরিবর্তন।
- প্রখর সূর্যালোক।
- কিছু ত্বকের যত্নের পণ্য যেসব স্কিনে জ্বালা করে।
- বংশগত ভাবেও মেছতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যাদের বংশে মেছতা সমস্যা রয়েছে।
আয়ুর্বেদিক উপায়ে মেছতার সমাধান
আয়ুর্বেদিক উপায়ে মেছতার সমাধান করার ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। আপনি চাইলে প্রাকৃতিক তেলের সহায়তা নিতে পারেন, কোনো ভেষজ বা অন্য ঘরোয়া পণ্যের সাহায্যে করতে পারেন। আবার চাইলে ফল দিয়েও করা যায়। আমরা এই তিনটি ভাগ নিয়েই আজ আলোচনা করবো।
প্রাকৃতিক তেলের মাধ্যমে মেছতার সমাধান
মেছতা দূর করতে প্রাকৃতিক বা নানা তেলের ব্যবহার এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। আমরা কয়েকটি জনপ্রিয় তেলের ব্যবহার এখানে দিচ্ছি:
আমন্ড অয়েল
আমন্ড প্রাকৃতিক ব্লিচিং হিসেবে কাজ করে। তাই এই তেল ব্যবহারে মেছতার দাগ হালকা হয়। এই তেলে থাকা ভিটামিন এ এবং ই ত্বককে ভেতর থেকে নারিশ করে।
ব্যবহারবিধি
- অল্প আমন্ড অয়েল গরম করে নিন।
- এবার ২ থেকে ৩ ফোঁটা অয়েল আঙ্গুলে লাগিয়ে নিয়ে মেছতার জায়গায় কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করুন।
- ঘন্টা খানেক রেখে ধুয়ে নিন।
আরগান অয়েল
আরগান অয়েলে আছে ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন ই ও ক্যারোটিনয়েডস–এই তিন উপাদান একসাথে কাজ করে ক্রমান্বয়ে মেছতার দাগ দুর করে।

ব্যবহারবিধি
- প্রথমে মুখ ভালভাবে ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে নিন।
- ২ বা ৩ ফোঁটা আরগান অয়েল নিয়ে মেছতার দাগযুক্ত জায়গায় ম্যাসাজ করুন।
সারারাত রেখে সকালে উঠে ধুয়ে ফেলুন। - প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এটি লাগাতে পারেন।
অলিভ অয়েল
অলিভ অয়েলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের ত্বকের ভেতর মেলানিনের মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন প্রতিহত করে।
ব্যবহারবিধি
- প্রথমে তেল গরম করে আঙ্গুলের ডগায় অল্প তেল নিয়ে সারামুখে মাসাজ করুন।
- ত্বক তেল শুষে নেয় ততক্ষণ মাসাজ করুন।
- এবার ঘন্টাখানেক রেখে হালকা উষ্ণ পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
- আপনি চাইলে দিনে ২-৩ বার আপনার মেছতার উপর অলিভ অয়েল লাগাতে পারেন।
টি ট্রি অয়েল
টি ট্রি অয়েলের হিলিং প্রোপার্টিজের কারণে এটি মেছতার দাগ কমায় সাথে ব্রণের সমস্যা দুর করে। তাছাড়া ত্বকের জ্বলুনিও কমায়। সেন্সিটিভ ত্বক যাদের তারা টি ট্রি অয়েলের সাথে ২-৩ ফোঁটা অন্য কোন তেল যেমন অলিভ অয়েল বা জোজোবা অয়েল মিশিয়ে ব্যবহার করলে মেছতার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

ব্যবহারবিধি
- ১-২ ফোঁটা অয়েল নিয়ে মুখে কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করে নিন।
- কয়েক ঘন্টা রেখে দিন।
- দিনে ১-২ বার এই এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করতে পারেন।
ঘরোয়া উপাদানের ব্যবহার
ঘরোয়া কিছু ভেষজ ও উপাদানেও মেছতার সমস্যা দূর করা যায়। আমরা এখানে চন্দন, টক দই এবং অ্যালোভেরার ব্যবহার দেখাচ্ছি।
চন্দন
চন্দনে অ্যান্টি এইজিং এবং অ্যান্টিসেপটিক উপাদান আছে যা ত্বকের হাইপারপিগমেনশন কমিয়ে মেছতার দাগ দূর করে থাকে। চন্দনের দুটো ব্যবহার রয়েছে মেছতার ক্ষেত্রে।
পদ্ধতি ১
- ২ টেবিল চামচ চন্দনের গুঁড়া, ১ টেবিল চামচ গ্লিসারিন, এবং লেবুর রস দিয়ে একটি প্যাক তৈরি করে নিন।
- প্যাকটি মেছতার কালো বা খয়েরী দাগের ওপর লাগান।
- কিছুক্ষণ পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- সপ্তাহে কয়েকবার ব্যবহার করুন।
পদ্ধতি ২
- ১ টেবিল চামচ কমলার রস, ১ চা চামচ লেবুর রস, ভিটামিন ই, ২ টেবিল চামচ চন্দন গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে নিন।
- ভাল করে এই প্যাকটি মুখে লাগান।
- আধা ঘন্টা পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করুন।
টক দই
এপিডারমাল মেলাজমা ধরনের মেছতা দূর করতে টক দই বেশ কার্যকর। টক দই দিয়ে প্যাক বানানোও সহজ। শুধু মধু এবং টক দই মেশালেই হয়ে যায়।
ব্যবহারবিধি
- ১ টেবিলচামচ টক দই ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে মাস্ক তৈরি করে নিন।
- এবার পরিষ্কার মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
- প্রতিদিন একবার করে ব্যবহার করতে পারেন।
অ্যালোভেরা
অ্যালোভেরা জেল ডার্ক সেলের ডিপিগমেন্টেশন করে বলে ২০১২ সালের পুরোনো একটি গবেষণা জানাচ্ছে। তাই মেছতার দাগ কমাতে এটি সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ব্যবহারবিধি
- ফ্রেশ অ্যালোভেরা নিয়ে মেছতার জায়গায় লাগান।
- ১৫ থেকে ২০ মিনিট মাসাজ করুন।
- অবশেষে ধুয়ে ফেলুন অথবা সারারাত ও রেখে দিতে পারেন।
ফলের রসের ব্যবহারে মেছতা দূরীকরণ
ফলের রস ব্যবহারেও মেছতার দাগ দূর করা সম্ভব। আমরা কয়েকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত পদ্ধতি এখানে দেখিয়ে দিচ্ছি।
পেঁয়াজের রস
মেছতা বা ব্রণ দূর করার জন্য বহুদিন ধরেই পেঁয়াজের রস ব্যবহারের চল রয়েছে। আর এই প্যাক প্রতিদিনই ব্যবহার করা যায়।

ব্যবহারবিধি
- একটি ছোট পেঁয়াজ কুঁচি করে নিন।
- কুঁচি করা পেঁয়াজের রস বের কর নিন।
- পেঁয়াজের রসের সাথে ১ চা চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার মেশান।
- মিশ্রণটি মেছতার উপর লাগিয়ে নিয়ে ৩-৪ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- এরপর ধুয়ে ফেলুন।
লেবুর রস
সংবেদনশীল ত্বকের জন্য লেবুর রস মেছতা দূরীকরণে সবচেয়ে কার্যকর। ভিটামিন সি আর অ্যাক্টি-অক্সিডেন্টই এখানে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ব্যবহারবিধি
- লেবুর রসের সাথে অল্প পরিমাণ মধু মিশিয়ে পাতলা করে নিন।
- এবার মেছতার দাগে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- এরপর ধুয়ে নিন।
টমেটোর রস
যাদের লেবু ব্যবহারে সমস্যা আছে তারা টমেটো ব্যবহার করতে পারেন। টমেটোতে ভিটামিন সি থাকায় এটি ত্বকের টাইরোসিনেজের এক্টিভিটি কমায় ও ত্বককে ফর্সা করে।

ব্যবহারবিধি
- একটি ছোট টমেটো নিয়ে ভালোভাবে ম্যাশ বা ভর্তা করে নিতে হবে।
- এই টমেটো মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
শেষ কথা
আয়ুর্বেদিক উপায়ে মেছতার সমাধান করার উপায়ের অভাব নেই। মেছতার তিনটি আলাদা ধরন রয়েছে। তারমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে অরগানিক স্কিন কেয়ারের মাধ্যমেই সমাধান করা যায়। তবে অবস্থা বেগতিক হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।



