ত্বক ও চুলের যত্নে গোলাপ যেন এক চির পরিচিত উপাদান। নানা রকম উপায়ে গোলাপ ফুল ব্যবহার করে ত্বক ও চুলের পরিচর্যা করা যায়।
ত্বক ও চুলের যত্নে গোলাপ বা গোলাপের পাপড়ির ব্যবহার বেশ প্রচলিত। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এই উপাদানটির আছে অসাধারণ কিছু উপকারিতা। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না কীভাবে গোলাপের পাপড়ি ব্যবহার করে ত্বক ও চুলের যত্ন নেওয়া যেতে পারে। তাহলে আজকের এই আর্টিকেলটিতে সেটাই জানা যাক।
এ আর্টিকেল পড়ে আপনারা জানতে পারেবেন –
- গোলাপ জলের উপকারীতা
- ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে গোলাপ জলের কয়েকটি ব্যবহার
- ব্রনের সমস্যা সমাধানে গোলাপ
- গোলাপ জল ও গ্লিসারিন ব্যবহারের নিয়ম
- রুপচার্চায় গোলাপের ৬টি ব্যবহার
- শীতে ত্বকের যত্নে গোলাপ জল
- মেকআপ ওঠাতে গোলাপের ব্যবহার
- চুলের যত্নে গোলাপ
- রোজ ওয়াটার প্রোডাক্টস
- রুপচর্চাতে গোলাপ জল ব্যবহার এর সময় সতর্কতা
গোলাপ জলের উপকারীতা
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার পাশাপাশি প্রদাহ কমানো সহ অনেক উপকারই করে গোলাপ জল। এতে আছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান – ট্যানিন ও অ্যান্থোসিয়ানিন, যা ত্বকের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, ত্বকের লালভাব নিয়ন্ত্রণ করে ও কোষকেও সুরক্ষিত রাখে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে গোলাপ জলের ব্যবহার
দই ও গোলাপ জল
আর্দ্রতা বাড়ানোর পাশাপাশি দই ত্বকে পুষ্টিও জোগায়। এক টেবল চামচ টক দইয়ের সঙ্গে এক টেবল চামচ গোলাপজল মিশিয়ে সারা মুখে লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট রেখে উষ্ণ জলে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে অন্তত ২ বার এই প্যাক ব্যবহার করুন।
আলু ও গোলাপ জল
আলুতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা আপনার ত্বককে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। কালো দাগ-ছোপও দূর করে। এক টেবলচামচ গোলাপ জলের সঙ্গে এক টেবলচামচ আলুর রস মিশিয়েমুখে অন্তত ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। সপ্তাহে ২ বার এই প্যাক ব্যবহার করুন।
টমেটো ও গোলাপ জল
টমেটোতেও রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। টমেটো সান ড্যামেজ থেকে ত্বককে বাঁচানোর পাশাপাশি ত্বককে করে তোলে উজ্জ্বল। টমেটোর ভিটামিন সি ত্বকের ইলাস্টিসিটি বজায় রাখে। এক টেবল চামচ গোলাপ জলের সঙ্গে এক টেবল চামচ টমেটোর রস মিশিয়ে সারা মুখে লাগিয়ে নিন। ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
ব্রনের সমস্যা সমাধানে গোলাপ
গোলাপ জলের নিয়মিত ব্যবহারে ব্রণের দাগ কমে যায়। দারুচিনি গুঁড়োর সঙ্গে গোলাপজল মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করুন। এই মিশ্রণ ব্রণের ওপর লাগিয়ে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ব্রণের সংক্রমণ, চুলকানি এবং ব্যথা অনেকটাই কমে যাবে।
গোলাপ জল ও গ্লিসারিন ব্যবহারের নিয়ম
একটি পাত্রে ৪ টেবিল চামচ গোলাপ জল নিন। ২ চা চামচ গ্লিসারিন নিন। একটি স্প্রে বোতল নিন। এই প্রতিটি উপকরণ ভালো করে মিশিয়ে দিন। তারপর স্প্রে বোতলে ঢেলে দিন। ব্যবহার করার আগে ঝাঁকিয়ে মুখে স্প্রে করুন। দিনে অন্তত ২ বার এই স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। এই স্প্রেটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই মুখ পরিষ্কার করে নিবেন।
রুপচার্চায় গোলাপের ৬টি ব্যবহার
গোলাপ ও চন্দনের ফেসপ্যাক
উপাদান : গোলাপের পাপড়ি, দুই টেবিল চামচ চন্দন গুঁড়া, গোলাপজল

তৈরির নিয়ম : প্রথমে গোলাপের পাপড়ি বেটে নিন। এর সঙ্গেই দুই টেবিল চামচ চন্দন গুঁড়া মিশিয়ে নিন। এরপর গোলাপজল মিশিয়ে মসৃণ পেস্ট তৈরি করুন।
ব্যবহার : পুরো মুখে লাগিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে করে ত্বক উজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি রোদে পোড়ে দাগও দূর হবে।
গোলাপ ও মধুর ফেসপ্যাক
উপাদান : গোলাপের পাপড়ি, এক টেবিল চামচ মধু

তৈরির নিয়ম : গোলাপের পাপড়ি বেটে নিন। এর সঙ্গেই এক টেবিল চামচ মধুমিশিয়ে নিন।
ব্যবহার : পরিষ্কার মুখে লাগিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকবে।
গোলাপ ও কমলালেবুর ফেসপ্যাক
উপাদান : গোলাপের পাপড়ি, কমলালেবুর খোসা, টকদই

তৈরির নিয়ম : গোলাপের পাপড়ি ও কমলালেবুর খোসা কয়েকদিন রোদে রেখে শুকিয়ে নিন। তারপর ভালো করে গুঁড়া করে নিন। এক টেবিল চামচ গোলাপ আর কমলালেবুর খোসার পাউডারের সঙ্গে টকদই মিশিয়ে তৈরি করে নিন ঘন পেস্ট।
ব্যবহার : মুখে আর গলায় মেখে আধা ঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত এই গোলাপের ফেসপ্যাক ব্যবহারে পাবেন উজ্জ্বল গোলাপি ত্বক।
গোলাপের আরো দারুন কার্যকরী কিছু ফেসপ্যাক সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন –
গোলাপের ক্লিনজার
উপাদান : শুকনা গোলাপের পাপড়ির গুঁড়া,

তৈরির নিয়ম : ন্যাচারাল ক্লিনজার তৈরির জন্য শুকনা গোলাপের পাপড়ি গুঁড়া করে নিতে হবে।
এরপর ১ টেবিল চামচ গোলাপের পাপড়ি গুঁড়া পানির সঙ্গে মিশিয়ে ক্লিনজার তৈরি করে নিতে হবে।
ব্যবহার : মুখে মেখে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে।
গোলাপের টোনার
উপাদান : এক মুঠো গোলাপের কুঁড়ি, রোজ এসেন্সিয়াল অয়েল
তৈরির নিয়ম : ১ কাপ পানি ফুটিয়ে নিন। এবার তার মধ্যে এক মুঠো গোলাপের কুঁড়ি দিয়ে পাত্রটি ঢেকে দিন।
এভাবে আধা ঘণ্টা রেখে দিন।
মিশ্রণটি ঠান্ডা হয়ে গেলে তার মধ্যে কয়েক ফোঁটা রোজ এসেন্সিয়াল অয়েল দিন। এবার মিশ্রণটি একটি পরিষ্কার স্প্রে বোতলে ভরে রাখুন।
ব্যবহার : মুখ পরিষ্কার করার পর এই টোনারটি মুখে স্প্রে করে নেবেন। ত্বকের তেল-ময়লা দূর করতে এই টোনারটি নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।
গোলাপের ময়েশ্চারাইজার
উপাদান : গোলাপ জল, মধু, শিয়া বাটার ও পছন্দ মতো কয়েকটি এসেন্সিয়াল অয়েল

তৈরির নিয়ম : সবগুলো উপাদান ব্লেন্ড করে নেবেন। এতে সিল্কি স্মুদ সাদা ক্রিমের মতো তৈরি হবে। ক্রিমটুকু একটি পরিষ্কার কৌটায় ভরে রাখুন।
ব্যবহার : ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এই ক্রিমটি প্রতিদিন রাতে মুখ পরিষ্কার করে ব্যবহার করুন।
মেকআপ ওঠাতে গোলাপের ব্যবহার
সামান্য গোলাপজল আর জলপাই কিংবা নারকেল তেল মিশিয়ে মুখে মালিশ করুন।
তুলা বা নরম সুতি কাপড় দিয়ে এবার মুখ মুছে নিন। মুখের মেকআপের পাশাপাশি সব ধরনের ময়লাও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
শীতে ত্বকের যত্নে গোলাপ জল
দেখতে দেখতে চলে আসছে শীতকাল। শীতে দরকার ত্বকের বাড়তি যত্ন। এই শীতে নীচের ৩ টি ফেসপ্যাকের সাহায্যে সহজেই ত্বকের যত্ন নিতে পারবেন।
গ্লিসারিন, লেবু ও গোলাপ জল : ৩ টেবিল চামচ গ্লিসারিন, ৩ টেবিল চামচ গোলাপ জল, ১ চা চামচ লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে বোতলে ভরে নিন।
এটি ফ্রিজে রাখুন। এই মিশ্রণটি প্রতি রাতে মুখে ও গলায় লাগিয়ে কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করুন। শীতের রুক্ষ আবহাওয়াতেও ত্বকের সুস্থতা বজায় থাকবে।
মুলতানি মাটি, দুধ ও গোলাপ জল : ২ টেবিল চামচ মুলতানি মাটির গুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ দুধ, ১ টেবিল চামচ গোলাপ জল একসঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন।
প্রথমে ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে মুছে নিন। তারপর এই পেস্টটি মুখে লাগিয়ে নিন।
২০ মিনিট রাখার পর ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ১-২ বার এই পেস্ট ব্যবহার করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে।
চন্দন এবং গোলাপ জল : ১ টেবিল চামচ চন্দন পাউডার, আধা চা চামচ নারকেল তেল, আধা চা চামচ আমন্ড অয়েল, ১ চা চামচ গোলাপ জল একসঙ্গে মিশিয়ে মসৃণ পেস্ট তৈরি করুন।
ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে মুছে নিন। তারপর এই পেস্টটি মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রাখুন।
শুকিয়ে গেলে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। সপ্তাহে ১-২ বার এই পেস্টটি ব্যবহার করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরে পাবেন।
চুলের যত্নে গোলাপ
চুলের রুক্ষতা দূর করতে : একটি পাত্রে পরিমাণ মতো অ্য়ালোভেরা জেল নিন।
তার সঙ্গে দুই চামচ গোলাপ জল মিশিয়ে নিন। স্ক্যাল্পে ও চুলের গোড়ায় ভালো করে মেখে রাখুন। এবার শুকিয়ে গেলে চুল ধুয়ে ফেলুন।
সপ্তাহে তিনবার এই হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করুন। চুলের রুক্ষতা কেটে যাবে। চুলকে করবে ঘন ও জেল্লাদার।
খুশকি দূর করতে : গোলাপজলের মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে নিন। ভালো করে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। সেই মিশ্রণ স্ক্যাল্পে আঙুলের ডগা দিয়ে মালিশ করে নিন।
৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর শ্যাম্পু করে নিন। খুশকি দূর হবে।
হেয়ার স্প্রে হিসাবে : হেয়ার স্প্রে হিসেবেও গোলাপ জল ব্যবহার করতে পারেন। অনেকেই গরমকালে ফ্রিজি চুলের সমস্যায় ভোগেন।
কোঁকড়ানো চুলও ফ্রিজি হয়ে যায়। তখন গোলাপ জল স্প্রে করতে পারেন। উপকার পাবেন।
রোজ ওয়াটার প্রোডাক্টস
বাজারে প্রচলিত কিছু গোলাপ জলের নাম নীচে দেওয়া হল –
১। Gulabari Premium Rose Water
২। Meril Rose Water Glycerine
৩। Labonno Herbal Rose Water
৪। Skin Cafe Rose Water
৫। Bioaqua Rose Petal Face Toner
রুপচর্চাতে গোলাপ জল ব্যবহার এর সময় সতর্কতা
- মুখে ফেস প্যাক লাগিয়ে চুলার সামনে বা রোদে যাবেন না।
- চোখে ও মুখের ভেতর যেন প্যাক ঢুকে না যায় সে ব্যপারে সতর্ক থাকবেন।
- চোখে প্যাক চলে গেলে অবশ্যই ঠান্ডা পানি দিয়ে ভালো ভাবে চোখ-মুখ ধুয়ে নিবেন।
- কোনো প্যাক লাগানোর ফলে এলার্জি হলে বা কোনো রিয়েকশন দেখা দিলে সাথে সাথে তা ব্যবহার করা বন্ধ করবেন ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।
ত্বক ও চুলের যত্নে গোলাপ ফুলের উপকারিতা অপরিসীম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট ক্রয়কৃত ফুলের ৮৪% ই নাকি গোলাপ।
গোলাপ শুধু সবার প্রিয় ফুলই নয়, প্রাকৃতিক রুপ চর্চাতেও এর জনপ্রিয়তার শেষ নেই।
প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো রুপচর্চা প্রেমীদের কাছেও ন্যচারাল স্কিন কেয়ার ও ন্যচারাল হেয়ার কেয়ার এর ক্ষেত্রে গোলাপের পাপড়ি ও গোলাপ জল যেন এক অপরিহার্য নাম।
গোলাপ ফুল যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি অসাধারণ সুন্দর এর গুণাগুণ।
তাই গোলাপের মতো সুন্দর হতে গোলাপ ব্যবহারের কোনো জুড়ি নেই।
FAQ
- গোলাপ জল কি ত্বকের জন্য ভালো?
গোলাপ জল ত্বকের জন্য ভীষণ উপকারী। সুস্থ-সুন্দর ত্বকের জন্য নিয়মিত গোলাপ জল ব্যবহার করতে পারেন।
- সব ধরনের স্কিনে কি গোলাপ ব্যবহার করা যায়?
গোলাপের মধ্যে যেসব উপাদান রয়েছে, তা সব রকম ত্বকের জন্যই উপকারী। গোলাপ যেকোনো ত্বকেই পুষ্টি যোগায় আর ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
- সপ্তাহে কয়বার ত্বকে গোলাপ ব্যবহার করা উচিত?
ভালো ফল পেতে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন ত্বকে গোলাপের গুঁড়া অথবা গোলাপ জল ব্যবহার করা উচিত।



