এই লেখাটিতে নিয়মিত হাঁটার উপকারিতা ও সঠিক নিয়মাবলী সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটতে হবে। শরীরের মেদ ভুরি ও ওজন কন্ট্রোলে রাখার জন্য হাঁটার গুরুত্ব অনেক। তাই বিশেষজ্ঞরা বলে বাঁচতে হলে হাঁটতে হবে প্রতিদিন।
স্কুল, কলেজ, অফিস ও সংসারের কাজ সেরে অনেকেই নিজের জন্য সময় বের করতে পারেন না। যার ফলে সব বয়সের মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরনের রোগ। তবে নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ থাকা সম্ভব। সব থেকে সহজ ব্যায়াম হলো নিয়মিত হাঁটা।
হাঁটলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটে। হাঁটার ফলে শরীরের বিভিন্ন পেশী গুলিতে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেনের দরকার হয়। দ্রুত হারে সেই অক্সিজেন পেশীতে পৌঁছে দিতে শরীরে রক্ত সঞ্চালন আরও দ্রুত হতে থাকে। তাই নিয়মিত যদি কিছু সময় হাঁটা যায় তাহলে শরীরের অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
ভালো থাকতে হাঁটার বিকল্প নেই
আমাদের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে হাঁটার বিকল্প নেই। নিয়মিত হাঁটার ফলে আমাদের শরীরের বিভিন্ন ধরনের উন্নতি ঘটে।
যা আমরা প্রথম পর্যায়ে বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন উন্নতি গুলো আমাদের সামনে আসবে।
শরীর সুস্থ রাখতে হাঁটার কোন বিকল্প নেই। যেকোনো বয়সের মানুষ প্রতিদিন অল্প কিছু সময় হেঁটে অনায়াসে নিজেকে সুস্থ রাখতে পারে।
প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটলে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিক্স, কোলেস্টেরল, হৃদরোগের সমস্যা, অবসাদ ইত্যাদি রোগ থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়।
তেমনি ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং আমাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি নিজেদের মন সুস্থ থাকে এবং ঘুম ও ভালো হয়। তাইতো শরীর বিশেষজ্ঞরা বলে সুস্থভাবে বাঁচতে হলে হাঁটতে হবে প্রতিদিন নিয়ম করে। এই লেখাটিতে জানানো হবে নিয়মিত হাঁটার উপকারিতা, আমাদের কখন হাঁটা উচিত, কিভাবে হাঁটা উচিত, এবং কোন কোন রোগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে হাঁটা উচিত এই সম্পর্কে।
নিয়মিত হাঁটার উপকারিতা
আমরা প্রথমেই জানবো নিয়মিত হাঁটার উপকারিতা সম্পর্কে যা আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।
আমাদের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন হাঁটার বিকল্প নেই। চলুন জেনে নেই নিয়মিত হাঁটার উপকারিতা গুলো সম্পর্কে।
১.ওজন নিয়ন্ত্রণ করে
শুধুমাত্র ডায়েটিং এর দ্বারা ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে আমাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নিয়মিত হাঁটার ফলে আমাদের শরীরের মেটাবালিজম প্রক্রিয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়।
তবে নিজেদের ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সপ্তাহের ৭ দিন, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে হাঁটতে হবে।
তবে এর থেকে বেশি হাঁটলে কোন ধরনের ক্ষতি নেই কিন্তু এর থেকে কম হাঁটলে, হাঁটার তেমন কোন উপকারিতা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
২.ভিটামিন ডি এর ভারসাম্য বজায় থাকে
শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকলে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। সকালে সূর্যের মিষ্টি আলোতে হাঁটার অভ্যাস থাকলে শরীরের ভিটামিন ডি’র অভাব পূরণ হয়।
ভিটামিন ডি যেমন হাড় মজবুত করে তেমনি ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাকে দূর করে।
৩.সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়
নিয়মিত হাঁটার ফলে আমাদের ব্রেইনে একটা সু-প্রভাব পড়ে যা আমাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে।
আপনি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন? অথবা নতুন কোন আইডিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না?
আপনি সকালবেলা প্রতিদিন একই সময়ে হাঁটুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান খুঁজুন, পেয়ে যাবেন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, হাঁটা আমাদের সৃজনশীল ফলাফল ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে।
ঘরের ভেতরে এবং বাইরে উভয় ওয়ার্কআউটের ক্ষেত্রে একই ফলাফল লক্ষণীয়।
৪.উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে
নিয়মিত হাঁটলে খুব সহজেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। রক্তচাপ কমানোর মুক্ষম ঔষধ হলো হাঁটাহাঁটি করা।
যাদের উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা রয়েছে তারা নিয়মিত সকাল সন্ধ্যা ৪৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করলে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে ১২ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১০,০০০ পা হাঁটলে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া যায়।
৫.অ্যাজমা রোগীদের ব্যায়াম
নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। সাধারণত অ্যাজমা রোগীরা ভারী কোন ধরনের ব্যায়াম করতে পারেনা। তাই তারা প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটার মাধ্যমে নিজেদের ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারে।
American College of Allergy Asthma and Immunology জানিয়েছে: হাঁটা, সাঁতার এবং অবসরে সাইকেল চালালে মানুষের শ্বাসনালীতে জ্বালা করার আশংকা কমে যায়।
৬.ডায়াবেটিক্স কমায়
হাঁটাহাঁটির ফলে আমাদের শরীরের মেটাবলিজম বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীরে গ্লুকোজের মেটাবলিজাম সঠিক হওয়া দরকার।
নিয়মিত হাঁটার ফলে গ্লুকোজ মেটাবলিজম বাড়ে তাই, ডায়াবেটিক্সের রোগীদের নিয়মিত হাঁটতে বলা হয়।
ডায়াবেটিক্স থাকলে সকাল সন্ধ্যা হাঁটাহাঁটির অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে ডায়াবেটিক্স থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ডায়াবেটিক্সের রোগীরা কখনোই খালি পায়ে ও খালি পেটে হাঁটতে যাবেন না।
৭.হৃদ রোগের ঝুঁকি কমায়
নিয়মিত হাঁটলে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং হৃদ যন্ত্রের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

নিয়মিত হাঁটলে হাইড্রেন্সিটি লাইফোপ্রোটিন বৃদ্ধি পায়, ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনে।
এছাড়াও হাঁটার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি পায় ফলে হৃদ যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মদক্ষতা বাড়ে।
৮.স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়
বয়স বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক মানুষের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে প্রবীনদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা বেশি দেখা যায়।

নিয়মিত হাঁটাহাঁটির ফলে মস্তিষ্কের রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়, যার ফলে প্রবীনদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা অনেকটা কমিয়ে আনে।
৯.হাড়ের ক্ষয় রোগ প্রতিরোধ করে
হাড়ের ক্ষয় রোগ বা অস্টিও আর্থারাইটিস রোগে হাড় দূর্বল হয়ে যায়।
যার ফলে অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নিয়মিত হাঁটা চলার ফলে এই রোগের থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে হাড় ও সন্ত্রস্তলের ব্যথা বেড়ে যায়।
হাড়ের জয়েন্ট গুলো সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন।
রোজ হাঁটাহাঁটি করলে জয়েন্টের ব্যথা অনেকটা কমে যায় এবং পায়ের পেশির শক্তি বৃদ্ধি পায়।
তাই যাদের হাড়ের ক্ষয় ও জয়েন্টে ব্যথা সমস্যা আছে তারা কমপক্ষে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটবেন।
১০.মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়
যখন আমরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপে থাকি, এবং আমাদের সময় খুবই খারাপ ভাবে অতিবাহিত হয়।
তখন আমাদের মানসিক শান্তি বৃদ্ধির জন্য হাঁটাহাঁটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানসিক অশান্তির মুহূর্তে একটু বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে আমাদের মন ও মেজাজ’কে সুস্থ করে তুলতে পারি।
এছাড়াও নিয়মিত হাঁটাহাঁটির ফলে মানসিক চাপ কমায়, বিষন্নতার উপসর্গ কমায়, বোধ শক্তি বৃদ্ধি করে, ডোপামিন ও সেরেটোনিন নিঃসরণ হওয়ার ফলে ভালোলাগার অনুভূতি জাগ্রত হয়, বিষন্নতা কেটে গিয়ে মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে, মানসিক চাপ ও টেনশনের প্রবণতা কমে।
এছাড়াও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়, ব্রেনের ক্ষয় রোধ হয় ও ভালো ঘুম হয়। নিয়মিত হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আমাদের জীবনে আরও অনেক ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
কখন হাঁটা উচিত?
আমরা অনেকেই হাঁটার কথা ভাবি, কিন্তু বুঝে উঠতে পারিনা হাঁটার জন্য কোন সময়টা সঠিক। আপনি ২৪ ঘন্টার মধ্যে যেকোনো সময় হাঁটতে পারবেন তবে বিশেষজ্ঞদের মতে হাঁটার জন্য সবথেকে ভালো সময় হলো সকাল বেলা। এছাড়াও আপনি চাইলে বিকালবেলা ও হাঁটতে পারেন।
দিনের সব সময় হাঁটাহাঁটি করা যাবে তবে কিছু সময় হাঁটতে যাওয়া সঠিক নয়। যেমন সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে হাঁটতে যাওয়া উচিত নয়।
ঘুম থেকে ওঠার অন্তত ৩০ মিনিট পরে হাঁটার জন্য বের হওয়া উচিত। আবার হেঁটে এসেই সাথে সাথে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক নয়।
এবং ভর পেট খেয়ে উঠে হাঁটতে যাওয়া ঠিক নয়। নিজেদের সুস্থ রাখতে সপ্তাহে ৭ দিনই ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা উচিত।
হাঁটার শুরুতে একটু অসুবিধা হলেও ধৈর্য ধরে একবার শুরু করলে আস্তে আস্তে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস হয়ে যাবে।
নিয়মিত হাঁটার ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে যেমনঃ
- হাঁটার আগে এবং পরে পানি পান করতে হবে।
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে হাঁটতে যাওয়া উচিত নয়।
- এবং হেঁটে এসে সাথে সাথে ঘুমানো উচিত নয়।
- দুপুরবেলা হাঁটতে যাওয়া উচিত নয়।
- হাঁটার ১ ঘন্টার মধ্যে কিছু খেয়ে নিতে হবে।
- হাঁটার সময় অবশ্যই ঢিলেঢালা পোশাক এবং উপযুক্ত জুতো ব্যবহার করা উচিত।
- সমতল ও ধূষণ মুক্ত পরিবেশে হাঁটা উচিত।
শেষ কথা
সুস্থ সবল ব্যক্তিরাও নিজেদের আরও সুস্থ রাখতে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। বাঁচতে হলে হাঁটতে হবে কথাটি সকলের জন্যই উপযুক্ত।
তবে ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত প্রেসার, অস্টিও আর্থারাইটিস ইত্যাদি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাঁটা উচিত।
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ আশা করি বাঁচতে হলে হাঁটতে হবে এই উক্তিটির অর্থ জানতে পেরেছেন। নিজেদের সুস্থ ও সবল রাখতে প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা উচিত।
আমাদের সকলের উচিত ব্যস্ত জীবনের মধ্য থেকে একটু সময় বের করে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা।



