রুপচর্চায় চালের গুড়া কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। ত্বক ও চুলের যত্নে চালের গুড়োর ব্যবহার নিয়েই এই আর্টিকেল।
আমরা সকলেই চাই আমাদের ত্বক ও চুল সুস্থ থাকুক। ত্বকের যত্নে চুলের যত্নে আমরা নানান ভাবে রূপচর্চা করি। এছাড়াও নানান প্রোডাক্ট ব্যবহার করি।
তবে চাইলেই ঘরে বসে প্রাকৃতিক ভাবে রূপচর্চা করা যায় চালের গুড়ার সাহায্যে। ত্বক ও চুলের যত্নে চালের গুড়া অন্যতম একটি উপাদান।
আসুন রুপচর্চায় চালের গুড়া পদ্ধতি জেনে নেই।
আর্টিকেলটির মাধ্যমে যে বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন:
ক) চালের গুড়ায় কি কি উপকারীতা রয়েছে।
খ) চালের গুড়া দিয়ে কিভাবে প্রাকৃতিক রূপচর্চা করা যায়।
গ) চালের গুড়া দিয়ে চুলের যত্ন কিভাবে নেয়া যায়।
ঘ) কিভাবে চালের গুড়া দিয়ে নানান স্ক্রাব, ফেসপ্যাক, ফেস মাস্ক তৈরি করতে হয়।
ত্বকের যত্নে চালের গুড়ার উপকারিতা
- চালে অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি এজেন্টের কাজ করে।
- সান ট্যান থেকে বাঁচাতে সানস্ক্রিনের মত কাজ করে চালের মধ্যে থাকা ফেরিউলিক অ্যাসিড।
- চালে থাকা ভিটামিন, মিনারেলস ও এসিড ত্বককে করে তুলে উজ্জ্বল ও ফর্সা।
- চালে থাকা প্রোটিন, ফ্রেলুইক এসিড ও অক্সিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকের জন্য অনেক উপকারী।
- চালের গুড়োয় থাকা ভিটামিন B ত্বকে আনে নতুন কোষ। যে নতুন কোষ ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া আটকায়।
- চালের গুড়ায় থাকে টাইরোসিনান যা ত্বকে থাকা মেলানিন উৎপাদন কমিয়ে আনে।
- ত্বকের কোলাজিন বাড়াতে চালের গুড়ো কার্যকরী। এতে ত্বক ঝুলে যাওয়া থেকে বাঁচে।
ত্বকের যত্নে চালের গুড়ার ব্যবহার
১) ত্বক উজ্জ্বল করতে ফেসপ্যাক
উপাদানঃ
চালের গুড়ো ৩ টেবিল চামচ
বেসন ২ চামচ
মধু ২ চামচ

তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্র নিয়ে সেখানে চালের গুড়ো বেসন ও মধু সব একসাথে মিশ্রণ করুন। ঘন পেস্ট তৈরি করুন।
ব্যবহারঃ
পাত্রে থাকা সকল উপাদানের মিশ্রণ চেহারায় ঘন করে লাগিয়ে নিন। প্যাকটি মুখে লাগিয়ে ৩০ মিনিটের মত রাখুন। তারপর কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ঘষে ঘষে ধুয়ে নিন। পানি দিয়ে চেহারা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। এই প্যাকটি কয়েক সপ্তাহেই ভালো ফলাফল দিবে।
উপকারিতাঃ
এই ফেসপ্যাক ব্যবহারের মাধ্যমে ত্বকের কালো ছাপ দূর হয়ে ত্বক হয়ে উঠবে উজ্জ্বল। এই ফেসপ্যাক কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার করলে নিজেই পার্থক্য বুঝতে পারবেন। নিজেই দেখতে পাবেন ত্বকের জেল্লা কতটুকু বেড়েছে।
২) দাগছোপ কমানোর জন্য ফেসপ্যাক
উপাদানঃ
চালের গুড়ো ৩ টেবিল চামচ
হলুদ গুড়ো ২ চা চামচ
কয়েক ফোঁটা লেবুর রস
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়ো, হলুদ গুড়ো নিন এবং তাতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস দিয়ে সব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে নিন।
ব্যবহারঃ
সকল উপকরণ দিয়ে বানানো মিশ্রণটি মুখে ভালোভাবে লাগিয়ে নিন। যতক্ষণ পুরোপুরি শুকিয়া না যায় ততক্ষণ অপেক্ষা করুন। যখন দেখবেন ফেসপ্যাক টি শুকিয়ে গেছে তখন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুদিন ব্যবহার করলেও হবে।
উপকারিতাঃ
আমাদের চেহারার নানান দাগছোপ দূর হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্রণ ও এর রয়ে যাওয়া দাগ দূর করতে সাহায্য করে এই ফেসপ্যাকটি। এতে চেহারার সৌন্দর্য ফিরে আসবে এবং পাওয়া যাবে দাগহীন ত্বক।
৩) আটা, দুধ আর চালের গুড়ার ফেসমাস্ক
উপাদানঃ
চালের গুড়া ১ চা চামচ
আটা এক চা চামচ
গুড়া দুধ ১ চা চামচ বা লিকুইড দুধ ২ চা চামচ

তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়া, আটা, গুড়া দুধ বা লিকুইড দুধ যেটা থাকে তা নিয়ম অনুযায়ী মিশিয়ে নিতে হবে।
ব্যবহারঃ
সকল উপাদান মিশ্রণ হয়ে গেলে মিশ্রণটি চেহারা ও গলায় ভালোভাবে লাগিয়ে নিতে হবে। তারপর ২০ মিনিটের মত অপেক্ষা করুন। তারপর কুসুম হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। ভালোভাবে পরিষ্কার করবেন যাতে কিছু লেগে না থাকে। সপ্তাহে দুই/তিন বার দেয়া লাগবে। পরে আপনিই দেখতে পাবেন পার্থক্য।
উপকারিতাঃ
এই সকল উপকরণ দিয়ে তৈরি ফেসমাস্ক টি যদি সপ্তাহে ২-৩ বার লাগানো হয়। তাহলে খুব ভালো ফল পাওয়া যাবে। এক মাসের মধ্যেই ত্বকের উজ্জ্বলতা, জেল্লা বাড়বে এবং চেহারা হয়ে উঠবে ঝলমলে সুন্দর।
৪) মুলতানি মাটি, টমেটো ও চালের গুড়োর ফেসমাস্ক
উপাদানঃ
চালের গুড়ো ১ চা চামচ
একটি টমেটোর অর্ধেক রস
মুলতানি মাটি আধা চা চামচ
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়ো, টমেটোর রস, মুলতানি মাটি একসাথে মিশিয়ে নিতে হবে।
ব্যবহারঃ
প্রথমে চেহারা ধুয়ে নিন। তারপর সকল উপকরণের মিশ্রণটি চেহারায় ও গলায় ভালভাবে লাগিয়ে নিন। অপেক্ষা করুন ২০ মিনিট পর্যন্ত তার পর মুখ ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন লাগাতে হবে।
উপকারিতাঃ
উপরের ফেসমাস্ক টি যদি সপ্তাহে ২/৩ বার ব্যবহার করেন তাহলে তো ফল পাবেন। তবে রোজ ব্যবহার করলে আরও ভালো হবে।
এই ফেসমাস্ক ব্যবহার করলে আপনার তৈলাক্ত ত্বক, অতিরিক্ত তেল, সেবাম দূর হবে।
৫) চালের গুড়া দিয়ে স্ক্রাব
উপকরণঃ
পরিমাণমতো চালের গুড়া
সামান্য লেবুর রস
পরিমাণমতো মধু
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়ো নিন। তারসাথে সামান্য লেবুর রস ও মধু দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন।
ব্যবহারঃ
সব কিছুর মিশ্রণ নিয়ে মুখে ৪/৫ মিনিট যাবৎ স্ক্রাব করতে থাকুন। তারপর ১৫-২০ মিনিটের মত অপেক্ষা করুন এবং পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
উপকারিতাঃ
আমাদের দেহে অসংখ্য লোম ও সেই লোমের লোমকূপ রয়েছে। যেখানে ঘাম ময়লা জমে থাকে।
সেই ময়লা পরবর্তীতে ত্বকের সৌন্দর্য নষ্ট করে। আর এখানেই এই স্ক্রাবটি কাজ করবে। এই স্ক্রাবটি ব্যবহার করলে লোমকূপের ময়লা বের করে দিবে।
৬) চালের গুড়ার ফেস টোনার
উপকরণঃ
চালের গুড়া ৩ চামচ
হলুদ গুড়া দু চামচ
সামান্য লেবুর রস
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়া, হলুদ গুড়া, লেবুর রস সব উপকরণ একসাথে মিশ্রণ করে নিন।
ব্যবহারঃ
সকল উপকরণের মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে নিন। যখন শুকিয়ে যাবে তখন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করুব উপকারীতা পাওয়া যাবে।
রাতে স্প্রে করে মুখে মালিশ করে নিতে হবে
উপকারিতাঃ
আমাদের চেহারায় অনেক সময় নানান ফুসকুড়ি-ব্রণ উঠে। ব্রণ চলে গলেও তার দাগ রয়ে যায়। আর এই ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলবে উপরের দেয়া ফেস টোনারটি ব্যবহার করলে।
৭) চালের গুড়ার ক্লিনজিং
উপকরণঃ
চাল ধোয়া পানি ১ কাপ
গোলাপ জল ১ বড় চামচ
বেকিং সোডা ১ ছোট চামচ

ভিটামিন ই ক্যাপসুল ১ পিস

তৈরির নিয়মঃ
একটি স্প্রে বতলে সব গুলি উপকরণ মিশ্রণ করে নিন।
ব্যবহারঃ
চেহারায় স্প্রে করুন এবং পরিস্কার কোন কাপড় দিয়ে মুছে নিন। যত সময় রাখুন না কেন শুকিয়ে যেন না যায়। ১০ মিনিট রাখলেও শুকিয়ে যাতে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
উপকারিতাঃ
এতে ত্বক টান টান হয় এবং দাগছোপ দূর হয়। কারণ Rice water এ ভিটামিন ই, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ত্বকের জন্য উপকারী।
চুলের যত্নে চালের গুড়ার উপকারিতা
চালের ধোয়া পানি, চালের গুড়া সবই চুলের জন্য অনেক উপকারী উপাদান। ত্বকের মতো চুলের যত্নে চাল অন্যতম। এর উপকারিতা,
- চুল মজবুত ও মসৃণ হয়।
- চুল সোজা/স্ট্রেট হয়।
- চুলের পুষ্টি দেয়।
- চুলের কুঁচকে ভাব দূর করে।
- ক্ষতিগ্রস্ত চুল ঠিক হয়।
- চুল কম পরে।
- চুলকে করে তুলে স্মুথ ও সিল্কি।
চুলের যত্নে চালের গুড়া এর ৩টি হেয়ার প্যাক
১) চালের গুড়া, ডিম, মুলতানি মাটির হেয়ার প্যাক
উপাদানঃ
ডিম ১ টি
মুলতানি মাটি ১ কাপ
চালের গুড়া ২ চা চামচ
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে ডিম, মুলতানি মাটি, চালের গুড়া সাথে সামান্য পানি দিয়ে মিক্স করুন।
ব্যবহারঃ
উপকরণটি তৈরি হয়ে গেলে তা চুলে ও স্ক্যাল্পে লাগিয়ে নিন। অপেক্ষা করুন ২০-৩০ মিনিটের মত। তারপর শ্যাম্পু ব্যবহার করে চুল ধুয়ে ফেলুন।
উপকারিতাঃ
কোকড়া চুল, অগছালো চুলকে একদম সোজা স্ট্রেট করে দিবে এই হেয়ার প্যাক টি।
২) চালের গুড়া আর মুলতানি মাটির হেয়ার প্যাক
উপাদানঃ
চালের গুড়া
মুলতানি মাটির হেয়ার প্যাক

তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে মুলতানি মাটি ও চুলের গুড়া নিয়ে ভালোভাবে মিক্স করে একটি পেস্ট তৈরি করুন।
ব্যবহারঃ
উপকরণ গুলি দিয়ে বানানো পেস্ট চুলে লাগিয়ে আধ ঘন্টা অর্থাৎ ৩০ মিনিটের মত অপেক্ষা করুন। তারপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।
উপকারিতাঃ
চালে থাকা স্টার্চ চুল স্ট্রেট করে এবং চুলকে করে তুলে স্মুথ ও সিল্কি।
৩) চালের গুড়োর শুকনো হেয়ার প্যাক
উপাদানঃ
চালের গুড়া
তৈরির নিয়মঃ
একটি পাত্রে চালের গুড়া বা Happy earth jesmin কম্পানির চালের গুড়া নিন। [ii]
ব্যবহারঃ
প্রথমে চালে গুড়ো ভেজা চুলে লাগাবেন। ৫ থেকে ১০ মিনিট ম্যাসাজ করবেন। তারপর পানি দিয়ে চুল ধয়ে ফেলবেন। ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে যেনো কোন কিছু লেগে না থাকে। [iii]
উপকারিতাঃ
এই ফর্মুলা ব্যবহার করলে চুল হবে সুন্দর নরম ও মসৃণ।
যদি চান Parmar impex Rice Face Pack বা Parmar impex Rice Face Pack ব্যবহার করা যেতে পারে। Hair care এর জন্য Mama Earth Rice Water Hair Mask ব্যবহার করতে পারেন।
চালের গুড়া ব্যবহারের সময় যে বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখবেন
- সব ধরনের চাল ব্যবহার করা যাবে না।
- চালের মিশ্রণ পরিমাণমতো ব্যবহার করতে হবে।
- চালে গুড়োর সাথে যেসব উপদান ব্যবহার করা হবে তা ঠিকমত যাচাই করে নেয়া।
- না জেনে চালকে সব জায়গায় ব্যবহার না করা।
- চালের গুড়ার মিশ্রণ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। নাহলে চুলে ও ত্বকে চালের কণা থেকে যাবে।
উপসংহার
আমরা জানলাম রুপচর্চায় চালের গুড়া ত্বক ও চুলের জন্য খুবই উপকারী একটি উপাদান। উপরের টিপসগুলো মেনে চালের গুড়া দিয়ে ত্বক ও চুলের প্রাকৃতিক উপায়ে যত্ন নিয়ে আপনিও হতে পারেন অনন্য সুন্দর।
FAQ
ক) রুপচর্চায় চালের গুড়া কি সব ধরনের ত্বকে ব্যবহার করা যায় ?
উঃ জ্বী যাবে। চালের গুড়া প্রাকৃতিক উপাদান এতে ক্ষতি নেই বললেই চলে।
খ) রুপচর্চায় চালের গুড়া ব্যবহার করে কি ফরসা হওয়া যায়?
উঃ চালের গুড়া ঠিকমত রূপচর্চায় কাজে লাগাতে পারলে অবশ্যই ত্বক হবে উজ্জ্বল, ফর্সা। আর দূর হবে দাগছোপঙ
গ) চালের গুড়া কি ত্বক পরিষ্কার করে ?
উঃ অবশ্যই, শুধু তাই নয় চালের গুড়া ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলে শরীরের লোমকূপের ময়লাও পরিস্কার হবে।



