সুস্থ জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন চাইলে মনোযোগ জরুরি। আর এই মনোযোগের চারটি সাধারন ছঁক রয়েছে।
সুস্থ জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার তাগিদ জাতিসংঘ সবসময়ই দিয়ে আসছে। এ নিয়ে কয়েকটি গবেষণাও হয়েছে। তারমধ্যে একটি গবেষণা জানাচ্ছে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
পশ্চিমা বিশ্বে প্লান্ট বেজড ডায়েটের কথা প্রচুর শোনা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে খাদ্যসংস্কৃতি পশ্চিমা বিশ্বের মতো না হওয়ায় সেটি অনুসরণ করলেই হবে না। উপমহাদেশে এমনিতেও শাক-সব্জি, নিরামিষ বা প্লান্ট বেজড খাবারের পাশাপাশি আমিষের ব্যবহার হয়।
তাছাড়া সবসময় নিজের আবহাওয়াকেও গুরুত্ব দিতে হয়। যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে প্রচুর বাটন মাশরুম হয়। সেখানে বাটন মাশরুম থেকে ভিটামিন ডি-৩ এর চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করা হয়। তবে উপমহাদেশে রোদ এমনিতেই রয়েছে।
অর্থাৎ, আপনার চারপাশ ও সংস্কৃতি অনুসারেই আপনাকে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। আজ আমরা মূলত খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কিভাবে সুস্থ জীবনের চর্চা করা যায় সে বিষয়েই কিছু পরামর্শ দেব।
সুস্থ জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
সুস্থ জীবনের স্বার্থে আপনাকে কিছু বাজে অভ্যাস ছাড়তে হবে। সুস্থ থাকতে হলে করনীয় অনেক রয়েছে। কিন্তু আজ আমরা আপনাদের ‘হ্যা’ বলার পরিবর্তে না বলবো। আপনার সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্যই লাইফস্টাইলে চারটি বিষয়ে মনোযোগ দিন।
পারলে সাদা চিনি এড়িয়ে চলুন
মাত্রাতিরিক্ত চিনি খাওয়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। কিন্তু চিনির বিকল্প কিছু বেছে নিতে গিয়ে অনেকেই ঝামেলায় পড়ছেন। চিনির পরিবর্তে এখন সুগার ফ্রি, মধু, রিফাইন্ড সুগার ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। তবে চিনির বিকল্প হিসেবে এ গুলো খেলেও ক্যালরির পরিমাণ একই থাকে। তাই ওজন বাড়ার শঙ্কা থাকেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরীরের গঠন অনুযায়ী একজন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক পুরুষ দিনে ৮ চামচ চিনি খেতে পারে। আর নারীরা দিনে ৬ চামচ চিনি খেতে পারেন। তবে পুরুষ এবং নারীর উভয়ের ক্ষেত্রেই শরীরের ওজন যথাযথ থাকলেই এ পরিমাণ চিনি খাওয়া যায়। দেহের ওজন অতিরিক্ত হলে এ পরিমাণ চিনি খাওয়া যায় না।
অর্থাৎ আপনার লাইফস্টাইলে সাদা চিনি ব্যবহারে সতর্ক হোন। একেবারে চিনি অবশ্য বাদ দেয়াও ঠিক নয়। কারণ চিনি আমাদের মস্তিস্কের খোরাকি জোগাড় করে দেয়। চিনির অভ্যাস তো রাতারাতি বদলানো যায় না। তাই কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
- সাদা চিনির বদলে লাল চিনি খাওয়ার অভ্যাস করুন।
- সুগার ফ্রি বা ল্যাবে বানানো প্রসেসড চিনি যতটা সম্ভব এড়ানোই ভালো।
- চিনির চাহিদা পূরণে ফল খেতে পারেন। ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকে।
- যেকোনো শরবতে চিনি মেশানোর অভ্যাস বাদ দিন।
- ডেইরি নানা পণ্য খেয়ে চিনিজাত নানা পণ্য এড়াতে পারেন।
ফাস্টফুড বা স্ট্রিটফুডের অভ্যাস নয়
অনেকেই বাড়িতে খাওয়ার সময় পান না। বাইরে অনেক ব্যস্ততা থাকে। সেটা বোঝা যায়।
কিন্তু অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুড এবং অনেকাংশে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঠেলে দেয়া স্ট্রিটফুড আপনার জন্য ইতিবাচক হতে পারে না।

ফাস্টফুড প্রচুর ক্যালরি শরীরে জমা করে। তাছাড়া ফাস্টফুড বা স্ট্রিটফুড আমাদের খাবারের সাইকেলও নষ্ট করে। এক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া জরুরি।
যদিও আমরা না করেছি, এই বদভ্যাস দূর করতে সমন্বয়মূলক পরামর্শ অনুসরণ করতে পারেন।
- সন্ধ্যায় ক্ষিদে লাগলে ছোলা, বাদাম বা ফাইবার আছে এমন স্বাস্থ্যকর কিছু স্ট্রিটফুড খেতে পারেন।
- ডুবোতেলে ভাজা, পুরোনো তেলে ভাজা, টক দিয়ে ভেজানো ফুচকা না খাওয়াই ভালো। পেটে গ্যাস হয়।
- আপনার পরের দিনের রান্নার প্রস্তুতি আগের দিন করে রাখুন। অথবা পুরো সপ্তাহ পরিকল্পনা রাখুন। বাড়িতেই রান্নার রুটিনে অভ্যস্ত হোন।
- বাড়ি থেকে ফল কেটে নিয়ে যেতে পারেন।
- ড্রাই ফ্রুটস অফিসে রাখতে পারেন। বেশি ক্ষিদে লাগবে খাবেন।
- বাড়িতে নিয়ম করে ফেরার অভ্যেস করুন। বাড়িতেই খাবার খান।
প্রসেস করা খাবার নয়
আমাদের জীবনে প্রসেস করা খাবার ভালোভাবেই প্রবেশ করেছে। সসেজ, রুটি তো রয়েছেই।
একই সঙ্গে এখন অনেক জায়গায় ইজি টু ইট, রেডি টু ইট মিল আসছে। বাইরের এসব পণ্য প্রসেস করা।
উচ্চমাত্রায় ক্যালরি, প্রোটিন ও ফ্যাটের পাশাপাশি প্রসেস করা খাবারে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লবন থাকে। তাছাড়া প্রসেস করা খাবার সংরক্ষণ করে রাখার জন্যও নানা এডিটিভ যুক্ত করা হয়।
এসব এডিটিভ স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর না হলেও আমাদের শরীরে প্রভাব ফেলে।

প্রসেস করা খাবার খেতে মজা এবং অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।
ফলে অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ কোলেস্টরল ও ফ্যাটি লিভারের মতো নানা রোগের ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ভিটামিন মিনারেলস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট না থাকায় পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।
আরও কিছু সমস্যা হলো:
- প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো তৈরি করতে হাইড্রোজেনেড হয়ে ট্রান্সফ্যাট হয়ে যায়। যা ওমেগা ৬ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রচুর পরিমাণে থাকে। এটি শরীর জারন হয়ে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন বাড়িয়ে তুলতে পারে।
- একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুরা প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে তিনবার প্রসেস বা জাঙ্কফুড খাবার খায় তাদের মধ্যে হাঁপানি ও একজিমা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবারগুলো রক্তের শর্করার মধ্যে স্পাইক জন্ম দেয় এবং ব্রনকে ট্রিগার করে।
- প্রসেস খাবারে ফ্যাটালেট থাকে যা দেহের হরমোনগুলোকে ব্যাহত করতে পারে। জন্মের ত্রুটিসহ প্রজনন সমস্যা দেখা দিতে পারে ।
- গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘমেয়াদে প্রসেস ফুড বা জাঙ্ক ফুড খেয়েছেন তাদের হতাশার ঝুঁকি ৫১% বেশি।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের ফলে মস্তিকের ডোপামিন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। আর ডোপামিন বা হ্যাপি হরমোন নিঃসরণ বন্ধ হলে বিসন্নতা আসবেই।
এক্ষেত্রে ফাস্টফুড বা স্ট্রিটফুড এড়াতে যে অভ্যাস করেছিলেন সেটিই অনুসরণ করার চেষ্টা করুন।
অনুসরণ করুন খাদ্যাভ্যাসের ডায়েরি
সুস্থ থাকতে হলে একটি রুটিন বানিয়ে নিতে হবে। খাদ্যাভ্যাস অন্তত এক সপ্তাহ চর্চা করতে পারলেই আপনার জন্য ইতিবাচক হবে।

আপনি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করবেন। এক্ষেত্রে সাধারণ কিছু টিপস রইলো:
- ফুড ডায়েরিতে আপনার দৈনন্দিন ক্যালরি গ্রহণের তালিকাও সংরক্ষণ করুন।
- সকালের নাস্তায় বেশি করে প্রোটিন এবং আঁশজাতীয় খাবার সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।
- খাবার ভালোমতো চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। টিভি বা মোবাইল দেখার সময় খাবেন না। খাবারেই মনোযোগ করুন। এই দশ-পনেরো মিনিট মোবাইল থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করুন।
- যেসব খাবার আপনাকে হাইড্রেটেড করবে সেসব খাবারই খান।
- নাশতায় চিনি, সাদা ময়দার রুটি, বিস্কুট যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
- মূল খাবারে কার্বহাইড্রেট বাদ না দিয়ে সীমিত মাত্রায় আনা প্রয়োজন। ঢেঁকিছাঁটা চাল, লাল আটা, মিষ্টিআলু, ডাল, সালাদ ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারেন।
- একঘেয়ে খাবারে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। খাবারের প্লেটে যেন প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন খাবার ওঠে সে চেষ্টা করুন।
- সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত–এই চারটি ভাগে ভাগ করুন আপনার দিন। খাবারের তালিকা এবং পরিকল্পনা রাখুন।
শেষ কথা
সুস্থ জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হলে আপনাকে নিয়মানুবর্তী এবং মনোযোগী হতে হবে। যদি তা করতে না পারেন তাহলে সুস্থতার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। আমরা আপনাদের চারটি কমন বিষয় দেখিয়ে দিয়েছি। আশা করি, কাজে আসবে।



