চুলের যত্নে ঘরোয়া টোটকা গুলো অনেকেই জানে না। চুল নারীর সৌন্দর্যের ভূষণ। মাথাভর্তি সিল্কি ও লম্বা চুল যে কোনো মেয়ের সৌন্দর্য কয়েক গুন বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু বর্তমান সময়ে চুলের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন প্রায় সব নারীই।
কারো হয়তো চুল পড়ে যাচ্ছে একদম হিসেব ছাড়া, আবার কারো চুল লম্বাই হচ্ছে না।
চুলের খুশকি, চুল ভেঙ্গে পড়া, চুলের রুক্ষতা এসব যেন কমন সমস্যা সবারই। বাজারের কেমিক্যাল যুক্ত পণ্য ব্যবহারে চুলের সমস্যার সমাধান তো হচ্ছেই না উল্টো ক্ষতি হচ্ছে।
চুলের যত্নে ব্যবহার করতে পারেন প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান।
এসব উপাদান কোনো ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না বরং নানাবিধ সমস্যার সমাধান করে।
তবে নিয়ম না জেনে প্রাকৃতিক উপাদান চুলে এপ্লাই করলে যথাযথ ফলাফল পাওয়া যাবে না।
সঠিক নিয়মে সঠিক উপাদান ব্যবহার করলে তবেই পাওয়া যাবে সুস্থ, সুন্দর, ঘন ও সিল্কি চুল।
চলুন জেনে নেয়া যাক সমস্যা সমাধানে চুলের যত্নে ঘরোয়া টোটকা সম্পর্কে।
চুলের যত্নে তেল এর নানাবিধ ব্যবহার
চুলের যত্নে আমরা সবথেকে বেশি ব্যবহার করি তেল। বিশেষ করে চুলের গোড়ায় পুষ্টি যুগিয়ে চুলকে আরও বেশি মজবুত করতে তেল এর বিকল্প নেই।
তবে বাজারের কেমিক্যাল যুক্ত তেল ব্যবহারের ফলে চুলের উপকারের পাশাপাশি ক্ষতিও কিন্তু কম হচ্ছে না। আর বর্তমানে নারীর চুল নিয়ে সব থেকে বড় সমস্যাই হলো চুল পড়া।
চুল পড়া নিয়ন্ত্রণে তেলের সাথে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান এড করে নিতে পারলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি কয়েকটি তেল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।
মেথির তেল:
বাজারের যে কোনো ব্রান্ড এর নারকেল তেল এর সাথে আস্ত মেথি মিশিয়ে জ্বাল করতে হবে। যতক্ষণ না মেথির রং একেবারে লাল হয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ জ্বাল করে নামিয়ে নিতে হবে।
ঠান্ডা হলে মেথি গুলো ছেকে তেল আলাদা করে বোতলে ভরে নিতে হবে। এই তেল সপ্তাহে ২/৩ দিন এপ্লাই করলে চুলপড়া বন্ধ হবে, চুল সিল্কি হবে এবং খুশকি দূর হবে।

শ্যাম্পু করার ৩০ মিনিট আগে অথবা শ্যাম্পু করার আগের দিন তেল লাগিয়ে নিতে হবে।
যাদের অতিরিক্ত খুশকির সমস্যা আছে তারা মেথির তেলের সাথে পাতি লেবুর রস এড করে ভালোভাবে মাসাজ করলে খুশকি দূর হবে।
অ্যালোভেরা তেল
অ্যালোভেরায় আছে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটারি ও অ্যান্টি ব্যক্টেরিয়াল গুন।
ফলে এটি আমাদের মাথায় জমে থাকা ঘাম ও রোগ জীবানু থেকে সৃষ্টি হওয়া সব ধরনের সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে, ফলে চুল হয় সুস্থ, সুন্দর ও ঝলমলে।
কিন্তু নিয়মিত অ্যালোভেরা জেল রেডি করে চুলে লাগানোটাও ঝামেলার বিষয়। তাই তৈরি করে নিতে পারেন অ্যালোভেরা তেল।
অ্যালোভেরা তেল তৈরির জন্য প্রথমে একটি অ্যালোভেরার পাতা ধুয়ে নিতে হবে।

পাতার ভেতর থেকে জেল বের করে গ্রাইন্ডারে গ্রাইন্ড করে নিয়ে সেই জেল আর নারকেল তেল একত্রে জ্বাল দিতে হবে।
তেল লাল হয়ে গেলে নামিয়ে ঠান্ডা করে ছেকে কাচের পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
সপ্তাহে ২/৩ দিন অ্যালোভেরা তেল ব্যবহার করলে মাথার ত্বকে কোনো ইনফেকশন জনিত সমস্যা থাকবে না এবং চুল পড়াও কমবে।
জবার তেল
জবা ফুল ও পাতা চুলের জন্য অনেক উপকারী। জবা ফুল ও এর পাতায় প্রচুর পরিমানে ভিটামিন-সি, এ এবং আলফা-হাইড্রোক্সিল অ্যাসিড থাকে, যা চুলের স্বাস্থ্য ভালো করে।
চুল পড়া কমায়, চুলের খুশকি দূর করে, চুল ঘন ও কালো করে।
জবা ফুলের তেল তৈরি করতে লাগবে ৮ টা লাল জবা ফুল, ৮ টা জবা পাতা এবং এক কাপ নারকেল তেল।

জবা ফুলের পাপড়ি ও পাতা ব্লেন্ড করে বা শিল পাটায় বেটে পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে।
কড়াইয়ে ১ কাপ তেল নিয়ে তার মধ্যে ফুল ও পাতার পেস্ট দিয়ে জ্বাল করতে হবে কয়েক মিনিট।
তারপর ঠান্ডা করে ছেকে বায়ুরোধী বোতলে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
প্রতি সপ্তাহে ২/৩ দিন মাথার স্ক্যাল্পে ও পুরো চুলে ভালোভাবে ম্যাসেজ করলে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
টিপস:
মাথায় তেল এপ্লাই করার সময় হালকা গরম করে নিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
মাথায় তেল এপ্লাই করে ১ দিনের বেশি সময় রাখা উচিত না।
তেল দেয়ার সময় স্ক্যাল্পে ভালোভাবে ম্যাসেজ করা উচিত।
প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হেয়ার প্যাক
সুস্থ ও সুন্দর চুলের অধিকারী হতে চাইলে সপ্তাহে একদিন বা ১৫ দিনে একদিন চুলে হেয়ার প্যাক লাগানোর অভ্যাস করতে হবে।
হেয়ার প্যাক আমাদের চুলের পুষ্টি যোগায় ও চুলের ড্যামেজ রোধ করে।
প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে চুলের যত্নে ঘরোয়া টোটকা গুলো চাইলে নিজেই বানিয়ে নেয়া যায় চমৎকার উপকারী হেয়ার প্যাক।
ড্যামেজ চুলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হেয়ার প্যাক:
যাদের অতিরিক্ত মাত্রায় চুল পড়ে এবং চুলের নিচের অংশ একদমই রুক্ষ ও ফাটা তাদের জন্য এই হেয়ার প্যাকটি ম্যাজিকের মতো কাজ করবে।
হেয়ার প্যাকটি তৈরি করতে প্রয়োজন হবে মেহেদি পাউডার, আমলকি পাউডার, চা পাতা, লেবুর রস, নারকেল তেল ও ডিম।
প্রথমে মেহেদি পাউডার ও আমলকি পাউডার ভালোভাবে মিশিয়ে তার মধ্যে দিয়ে দিতে হবে চা পাতা জ্বাল করা গাড় লাল পানি।
চা পাতার পানিতে পাউডার মিক্স করা হয়ে গেলে তার মধ্যে দিতে হবে নারকেল তেল।
কেউ চাইলে এখানে অলিভ অয়েল বা আমন্ড অয়েলও ব্যবহার করতে পারবে। দিয়ে দিতে হবে লেবুর রস। এবার এই মিশ্রণটিকে ঢেকে রেখে দিতে হবে ১ রাতের জন্য।
পরেরদিন ব্যবহার করার সময় পুরো ১ টি ডিম কুসুম সহ মিশ্রণটির মধ্যে দিয়ে ভালোকরে মিশিয়ে চুলে লাগাতে হবে।
চুলের গোড়া থেকে একদম আগা পর্যন্ত সব জায়গায় সমানভাবে লাগিয়ে অপেক্ষা করতে হবে ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা।
এরপর ধুয়ে ফেললেই দেখা যাবে ন্যাচারাল হেয়ার প্যাক এর ম্যাজিক। চুল হবে একদম ঝলমলে সুন্দর ও মজবুত।
এভাবে প্রতি সপ্তাহে একদিন এই হেয়ার প্যাক ব্যবহার করলে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
খুশকি দূর করতে হেয়ার প্যাক:
মাথার খুশকি দূর করার জন্য আছে একদমই সহজ এক পদ্ধতি। মাত্র দুটি উপকরণ দিয়ে রেমিডি তৈরি করে চিরতরে মাথার খুশকি দূর করা সম্ভব।
এই হেয়ার প্যাকটি শুধুমাত্র যাদের মাথায় খুশকি আছে তারাই ব্যবহার করতে পারবে। খুশকি দূর করার হেয়ার প্যাক তৈরির জন্য প্রথমে একটু আদা নিয়ে বেটে বা গ্রেটার দিয়ে গ্রেট করে নিতে হবে।
সেই আদা ছেকে আাদার রস বের করতে হবে। খুশকি দূর করতে আদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আদার রসের সাথে নিম তেল বা অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে মাথায় বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ম্যাসেজ করতে হবে।
এভাবে ৩০ মিনিট রাখার পরে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলতে হবে।
এই রেমিডি টি প্রতি সপ্তাহে একবার ব্যবহার করলে চুলে খুশকির সমস্যা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।
চুলের যত্নে আরও কিছু টিপস
বিশেষজ্ঞদের মতে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন শ্যাম্পু করা উচিত।
প্রতিবার শ্যাম্পু করার ৩০ মিনিট আগে চুলে হট অয়েল ম্যাসেজ করা ভালো।
শ্যাম্পু করার সময় শ্যাম্পুর সাথে চিনি ও লেবুর রস এড করে নিলে চুল অনেক সিল্কি ও প্রানবন্ত লাগে।
ভেজা চুল আচরানো থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ ভেজা অবস্থায় চুলের গোড়া বেশ নরম থাকে।
তৈলাক্ত ত্বকের অধিকারীদের প্রয়োজনে ১ দিন পরপর শ্যাম্পু করা উচিতসপ্তাহে বা ১৫ দিনে অন্তত ১ দিন যে কোনো হেয়ার প্যাক ব্যবহার করা উচিত।



