ত্বকে তৈলাক্ত ও ব্রন দৈনন্দিন স্টাইলে আমাদের সবথেকে ব্যাঘাত ঘটায় । মুখে অতিরিক্ত তেলতেলে ভাবের কারনে কোনো স্টাইলেই যেন আমাদের আউট ফিট সুন্দর ভাবে ফুটে ওঠে না।
কোনো ধরনের মেকআপ সেট হয় না স্কিন এর সাথে। সবথেকে বড় কথা হলো, তৈলাক্ত ত্বকে খুব সহজেই ব্রনের আক্রমন ঘটে।
পুরো মুখ জুড়ে ভেসে ওঠে ছোট বড় ব্রন। আর এই ব্রন থেকে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের ইনফেকশন ও স্পট। কেউই চায় না তার মুখভর্তি ব্রন থাকুক।
কিন্তু এই ব্রনের সমস্যা সমাধান করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই বেশ কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে।
তৈলাক্ত ত্বক ও ব্রন কেন হয়?
১. বিশেষজ্ঞরা ত্বকে ব্রন সৃষ্টি হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কারনকে দায়ী করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো ত্বকের সেবাম অয়েল। ত্বকের সেবাসিয়াস নামক গ্রন্থি থেকে সেবাম নামের এক ধরণের তেল বের হয়। এটা আমাদের স্কিনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ভাড়ি মেকআপ, পলিউশন এর ফলে যখন এই সেবাম অয়েল টা আমাদের স্কিনের মধ্যে আটকা পড়ে যায় তখন এটা থেকে ব্রনের সৃষ্টি হয়।
২. নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার না করলে রোগ জীবানু জমতে জমতে ত্বকে ইনফেকশন সৃষ্টি হয় সেখান থেকে ব্রন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. অতিরিক্ত তেল মুখের মধ্যে ধুলো ময়লা ধরে রাখে ফলে ব্রন সৃষ্টি হয়।
৪. সঠিক সময়ে নিয়মিত না ঘুমালে এবং চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ব্রন হতে পারে।
৫. না বুঝে ত্বকের পক্ষে ক্ষতিকর প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে।
৬. প্রাইমার ব্যবহার না করে খালি ত্বকে ফাউন্ডেশন ও ভারি মেকআপ ব্যবহার করলে।
৭. পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ব্রন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
৮. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও টেনশন থেকেও ব্রনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
৯. নিয়মিত স্কিন কেয়ার রুটিন ফলো না করলে।
১০. কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ থেকেও ব্রনের সমস্যা সৃষ্টি হয়।
১১. তৈলাক্ত ও ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার বেশি খেলে ব্রন হতে পারে।
১২. মাথায় খুশকি থাকলে তা থেকেও মুখে ব্রনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
তৈলাক্ত ও ব্রন যুক্ত ত্বক থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়
ত্বকের ব্রন দূর করার জন্য যা কিছুই মুখে এপ্লাই করুন না কেন, বিশেষ কিছু নিয়মকানুন দৈনন্দিন জীবনে না মানলে ব্রনের সমস্যা সমাধান করা বেশ কঠিন। তাই আমাদের প্রতিদিনের লাইফ স্টাইলে কিছু নিয়ম কানুন অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
ব্রনের সমস্যা সমাধানে যে বিষয়গুলো আমাদের নিয়মিত মেনে চলা উচিত:
১. দিনের মধ্যে ৫/৬ বার (প্রয়োজনে তার থেকেও বেশি) মুখ ধুতে হবে। কেননা মুখে অতিরিক্ত তেল জমে থাকলেই তা ধুলোবালি মুখের সাথে আটকে রাখে।
২. প্রতিদিন ৩/৪ লিটার পানি পান করতে হবে। পানি আমাদের শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখে ও পেট পরিষ্কার রাখে। এর ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ দূর হয়। তাই ব্রনের সমস্যারও সমাধান হয়।
৩. নিয়মিত মুখে একনি প্যাক ব্যবহার করতে হবে (ঘরোয়া একনি প্যাক সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত দেয়া আছে)। মার্কেটে বিক্রি করা একনি প্যাক গুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু কেনার আগে অবশ্যই ভালো মন্দ বিবেচনা করে কিনতে হবে।
৪. অন্যের ব্যবহৃত টিস্যু, টাওয়েল, মেকআপ ব্রাশ, স্পঞ্জ ব্যবহার করা যাবে না। এবং নিজের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও অন্যকে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না।
৫. ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার, অতিরিক্ত তেল জাতীয় খাবার ও স্ট্রিট ফুড খাওয়া পরিহার করতে হবে।
৬. মাথায় খুশকির সমস্যা থাকলে প্রথমে তা দূর করতে হবে। মাথার খুশকি দূর না করতে পারলে ব্রন থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কঠিন।
৭. মেকআপ করার পূর্বে অবশ্যই প্রাইমার ব্যবহার করতে হবে এবং ভালো ব্রান্ডের মেকআপ ব্যবহার করতে হবে।
৮. ঘুমাতে যাওয়ার আগে মেকআপ রিমুভ করে মুখ ভালোভাবে ক্লিন করে নিতে হবে।
৯. আমাদের আশেপাশে অনেক বিউটি প্রোডাক্ট আছে যগুলো নরমাল ত্বকের জন্য বেশ উপকারী কিন্তু অয়েলি স্কিন এর জন্য আবার এসব প্রোডাক্টই বেশ ক্ষতিকর। তাই বিউটি প্রোডাক্ট কেনার আগে খেয়াল রাখতে হবে এগুলো স্কিনের সাথে মানানসই কিনা। বিশেষ করে নাইট ক্রিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ সচেতন থাকতে হবে।
১০. সব সময় নিজেকে রিল্যাক্স ও চাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
অয়েলি ও ব্রন যুক্ত ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক উপাদান
আমাদের আশেপাশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান আছে যেগুলো ব্রন দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিকভাবে এই উপাদানগুলো ব্যবহার করতে পারলে ত্বকের অয়েল কনট্রোল হবে হবে এবং ব্রন দূর হবে ম্যাজিকের মতো।
চলুন জেনে নেয়া যাক ব্রনের সমস্যা দূর করতে উপকারী কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদান সম্পর্কে এবং এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত।
১. অ্যালোভেরা
ব্রনের সমস্যায় অ্যালোভেরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে থাকা এন্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ত্বকের রোগ জীবানুর সংক্রমণ কমায় এবং ক্লিনজিং এর কাজ করে। অ্যালোভেরা ত্বকের অয়েল কনট্রোল করে ত্বককে করে আরও বেশি উজ্জ্বল।

অ্যালোভেরা পাতার খোসা ছাড়িয়ে জেল বের করে গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এই অ্যালোভেরা মিশ্রিত পানি প্রতিদিন সকালে ফেসওয়াশ হিসেবে ব্যবহার করলে ব্রনের সমস্যা চিরতরে দূর হবে। অ্যালোভেরা মিশ্রিত পানি নরমাল ফ্রীজে ১ সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যাবে।
২. মসুর ডাল
মুখের অয়েল কনট্রোল করতে সবথেকে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে মসুর ডাল বাটা। মসুর ডাল ত্বকের অয়েল শুষে নিয়ে ত্বককে নরমাল রাখে, ফলে ত্বকে ময়লা ও ধুলো আটকে থাকতে পারে না। যার ফলে মুখে ব্রন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না এবং আগের ব্রনও ধারাবাহিক ভাবে কমতে থাকে।

মসুর ডালের সাথে পোলাওয়ের চাল বেটে তার সাথে লেবুর রস মিশিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করলে ত্বকের অয়েল জনিত কোনো সমস্যা থাকবে না। চাল ডাল বেটে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রাখা যাবে অনেক সময় ধরে।
ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা ঝামেলার মনে হলে চাল ডাল গ্রাইন্ডারে পাউডার করে বয়াম ভরে রেখে প্রতিদিন একটু পানি মিশিয়ে স্ক্রাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
৩. নিম পাতা
ভেষজ গুন সম্পন্ন খুবই উপকারী পাতা নিম। নিমের গুন সম্পর্কে না বললেও সবাই জানে যে আমাদের স্কিনের যে কোনো সমস্যার জন্য নিমপাতা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। নিমে থাকা এন্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ও অন্যান্য ভেষজ গুণ ত্বকের সব ধরনের ইনফেকশন থেকে ত্বককে রক্ষা করে।

নিমপাতা ও কাচা হলুদ একসাথে বেটে ফেইস প্যাক এর মতো লাগিয়ে ৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে। এই প্যাকটি সপ্তাহে এক দিন বা দুই দিন নিয়মিত ব্যবহার করলে ব্রনের সমস্যা পুরোপুরি কমে যাবে।
৪. রসুন
ব্রনের চরম শত্রু রসুন। রসুন এর রস ব্রনের সমস্যায় ম্যাজিকের মতো কাজ করে এবং এটি ব্যবহার করাও বেশ সহজ। তাই চাইলে যে কোনো সময় হাতে ২ মিনিট সময় নিয়ে ব্যবহার করতে পারেন এই ঘরোয়া টোটকা টি।

২/১ কোয়া রসুন থেতলে তার রস বের করে ব্রনের উপরে লাগিয়ে নিন। পুরো মুখে লাগাবেন না। শুধুমাত্র যে যে স্থানে ব্রন আছে সেখানে এপ্লাই করে ৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে। সবথেকে বেশি ভালো হয় যদি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে লাগিয়ে সারারাত রেখে দেয়া যায়। এভাবে নিয়মিত কিছুদিন রসুন এর রস ব্যবহার করলে ব্রন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে যাবে।
তৈলাক্ত ত্বক থেকে মুক্তি পেতে ও ব্রনের সমস্যা দূর করতে সবথেকে বড় বিষয় হলো ত্বকের এক্সট্রা যত্ন নেয়া, ত্বক সবসময় পরিষ্কার রাখা, এবং নিজের লাইফ স্টাইলে সঠিক নিয়ম মেইনটেইন করা।



